ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী এবং ভোটতালিকা সংশোধনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের ভেতরে এক অভূতপূর্ব নজির তৈরি হয়েছে—যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কমিশনের বাকি দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার লিখিত ও আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। ভারতের স্বাধীন গণতান্ত্রিক কাঠামোর ইতিহাসে সাংবিধানিক সংস্থার ভেতরে এমন তীব্র অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং অনাস্থার ঘটনা অত্যন্ত বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ।
এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মূল সূত্রপাত দেশের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে বিহার থেকে শুরু হওয়া ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। এই প্রক্রিয়ার আওতায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটারদের নাম সংযোজন, এবং ডেটাবেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে দুই নির্বাচন কমিশনার কমিশনারের মূল সিদ্ধান্তগুলো থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন এবং কড়া আপত্তি জানান।
বিশেষ করে, নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ‘ফর্ম-৬’-এ নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিবর্তন আনার অভিযোগ ওঠে। দুই নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ ছিল, আইনি বিধান বা বিধি সংশোধন না করেই ওই ফর্মে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে যা সম্পূর্ণ “অনুমোদনহীন ও অবৈধ” (unauthorized and illegal)। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে ভোটারদের নাম পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত এবং গোয়ার মতো অঞ্চলে বহু যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঘটনা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো ভোটার তালিকার ডিজিটাল পরিকাঠামো ও তথ্যভাণ্ডার (Database) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার ‘এরোনেট’ (ERONet) এবং নতুন ‘ইসিআইনেট’ (ECINet)-এর নিয়ন্ত্রণ দিল্লির কেন্দ্রীয় দপ্তরে কুক্ষিগত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন দুই কমিশনার। তাদের আশঙ্কা ছিল, এভাবে কেন্দ্রীয়করণ করা হলে সাংবিধানিক কর্মকর্তা অর্থাৎ ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (EROs) ক্ষমতা খর্ব হবে এবং তৃণমূল স্তরে ভোটারের অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে।
পরিস্থিতি এতটাই তীব্র আকার ধারণ করে যে, দুই নির্বাচন কমিশনার ক্যাবিনেট সচিবের কাছে পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ জানিয়ে হস্তক্ষেপ দাবি করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, আইটি নীতি বা কাজের পুনর্বণ্টন সংক্রান্ত বহু সিদ্ধান্ত তাঁদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বা না জানিয়েই রূপায়ণ করা হয়েছে।
সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি বহু-সদস্যের সাংবিধানিক সংস্থা, যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য কমিশনারদের পদমর্যাদা সমান। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বলা হয় ‘ফার্স্ট অ্যামোং ইকুয়ালস’ বা সমকক্ষদের মধ্যে প্রধান, যার অর্থ এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা সিইসি-র নেই। ২০২৩ সালের নতুন নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী কমিশনের কাজ সর্বসম্মতভাবে বা ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়ার কথা।
কিন্তু সাম্প্রতিক এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তগুলোতে কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (অর্থাৎ দুই নির্বাচন কমিশনার) আস্থাশীল ছিলেন না বা তাঁদের মতকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও কমিশন সূত্র পরে দাবি করেছে যে সমস্ত সিদ্ধান্তই সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে, তবুও এই অভ্যন্তরীণ ফাটল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমানসে বড়সড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হলো অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, আর সেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রহরী হলো নির্বাচন কমিশন। যদি সেই প্রহরীর ঘর থেকেই স্বাধিকার হরণের বা অনাস্থার সুর ওঠে, তবে তা দেশের আস্থার ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়া দেয়। দুই নির্বাচন কমিশনারের অনড় আপত্তি এবং লিখিত দ্বিমত প্রকাশের এই ঘটনা কেবল প্রশাসনিক মতপার্থক্য নয়, বরং এটি ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকটজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। আগামী দিনে নির্বাচনী সংস্কার এবং কমিশনের স্বচ্ছতা রক্ষায় এই ঘটনা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

