সব্যসাচী মল্লিক এবং রাষ্ট্রহীন বা সীমানাহীন বিপ্লবের ধারণা

১০১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

“প্রতিবাদেরও দণ্ড আছে, এবং মনে করি তারও পুনরায় প্রতিবাদ আবশ্যক। নইলে গায়ের জোরকেই প্রকারান্তরে ন্যায্য বলে স্বীকার করা হয়। এর জন্যই প্রতিবাদ চেয়েছিলাম।”- পথের দাবী প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।


​পৃথিবীর মানচিত্র কেবল কিছু কাল্পনিক রেখা ও ভূখণ্ডের বিন্যাস নয়; এটি আসলে মানুষের তৈরি বিভাজনের দীর্ঘ ইতিহাস, যার প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে রয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রক্তপাত আর শৃঙ্খলপরা মানুষের দীর্ঘশ্বাস। রাষ্ট্র নামের অদৃশ্য অথচ সর্বগ্রাসী যন্ত্রটি যখন মানুষের স্বাধীনতাকে গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলে, তখনই ইতিহাসের গর্ভে জন্ম নেয় এমন কিছু ব্যতিক্রমী সত্তা, যারা কোনো নির্দিষ্ট সীমানার বেড়াজালে নিজেদের বন্দী রাখতে চান না। তেমনি এক প্রমিথিউস-সদৃশ চরিত্র ‘সব্যসাচী মল্লিক’। তিনি কেবল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের কোনো সাধারণ বিদ্রোহী নন; তিনি হলেন আন্তর্জাতিকতাবাদী চেতনার এক প্রদীপ্ত শিখা, যিনি জাতীয় সীমানা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কৃত্রিম দেওয়ালগুলোকে নিমেষে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিশ্বজনীন মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। সাহিত্যের ক্যানভাসে সব্যসাচী কেবল একটি নাম নন, তিনি এক চিরকালীন দ্রোহের ব্যাকরণ—যিনি মানচিত্রের রক্তিম দাগগুলোকে অস্বীকার করে সমগ্র পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের বেদনার সাথে নিজের আত্মাকে একীভূত করে নিয়েছিলেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


​
​শরৎচন্দ্র যখন বিশ শতকের প্রথমার্ধে সব্যসাচী চরিত্রটি রূপায়ণ করছিলেন, তখন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম মূলত দেশীয় গণ্ডির মধ্যে বন্দি এক স্বাধিকার আন্দোলনের রূপ নিয়েছিল। কিন্তু সব্যসাচী সেই গতানুগতিক জাতীয়তাবাদের সীমানা বহুদূর পেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁর বিদ্রোহ কেবল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম ছিল না; বিশ্বের যে প্রান্তেই সাম্রাজ্যবাদের শোষণে মানবতা অবমূল্যায়িত হয়েছে, সেখানেই তিনি নিজের অস্তিত্বকে সঁপে দিয়েছিলেন।


স্বরাজের লড়াই আসলে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং আত্মমর্যাদার লড়াই৷ রাষ্ট্রহীন বা সীমানাহীন বিপ্লবের মূল কথাই হলো—শোষক ও শোষিতের লড়াইয়ে কোনো ভৌগলিক সীমানা থাকে না৷ সব্যসাচী মল্লিকের যাত্রা তাই এক রাষ্ট্রহীন মানুষের শেকড়হীনতার বেদনা এবং বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এশিয়া থেকে ইউরোপ—তাঁর বিচরণ ছিল সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে এক মুক্ত পৃথিবীর অন্বেষণ। সব্যসাচীর কাছে ‘রাষ্ট্র’ বা ‘বর্ডার’ এক মায়ার সংসার মাত্র।
​আজকের একবিংশ শতাব্দীর এই গ্লোবালাইজড যুগে পৃথিবী কেবল প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের শিকার নয়, বরং এটি বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজিবাদ, অদৃশ্য প্রযুক্তিগত মনোপলি এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার করাল গ্রাসে বন্দি। জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্পোরেট শোষণ এবং অভিবাসন সংকট আজ কোনো একক দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এগুলি আজ সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের সংকট।


​এই বহুমুখী সংকটের যুগে দাঁড়িয়ে সব্যসাচীর বিদ্রোহী সত্তাকে কেবল একটি উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র বা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে দেখা ভুল হবে। তাঁকে দেখতে হবে বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত মানুষের একতার প্রতীক৷

“তোমরা তাদের কল চালাবার, বোঝা বইবার জানোয়ার! অথচ তোমরাও ত তাদেরি মত মানুষ, তেমনি পেট ভরে খাবার, তেমনি প্রাণ খুলে আনন্দ করবার জন্মগত অধিকার তোমরাও যে ভগবানকে কাছ থেকে পেয়েচ এই সত্যটাই এরা সকল শক্তি, সকল শঠতা দিয়ে তোমাদের কাছ থেকে গোপন রাখতে চায়।”- সব্যসাচী মল্লিক৷ পথের দাবী

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস পথের দাবী


​সব্যসাচীর রাজনৈতিক সত্তার সবচেয়ে গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক দিকটি হলো তাঁর ‘রাষ্ট্রহীন’ ও ‘পরিচয়হীন’ জীবন। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে এক মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী, যার নিজস্ব কোনো বৈধ রাষ্ট্রীয় আশ্রয় বা পাসপোর্ট ছিল না।​আজকের পৃথিবীতে শরণার্থী সমস্যা, যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ এবং রাষ্ট্রহীন মানুষের স্রোত কোটি ছাড়িয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও হানাহানির কারণে যারা আজ ভিটেমাটি হারিয়ে সীমানা পেরোতে বাধ্য হওয়া সব্যসাচীর জীবন যেন তাদেরই এক নিঃসঙ্গ অগ্রদূত।


​ রাষ্ট্র যখন নিজেই নিপীড়কের ভূমিকা নেয়, তখন রাষ্ট্রহীনের লড়াই হয়ে ওঠে আগমীর পায়োনিয়র।জাতীয়তার অহংকার ও পরিচয়ের রাজনীতি যখন মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভাজিত করে, সব্যসাচী মল্লিক তখ হয়ে ওঠেন ‘মানবতা’ ও ‘মুক্তির’ পক্ষে আজকের নেতা৷
​
​”যেখানে মানুষ নির্যাতিত, সেখানেই সব্যসাচী উপস্থিত।”- আসলে যে যেখানেই লড়ে যায় সে আমাদেরই লড়া৷ ​এই দর্শন গতানুগতিক দেশপ্রেমের সঙ্কীর্ণতাকে ভেঙে বিশ্বজনীন মানবতাবাদের সাথে যুক্ত করে। আজকের দিনে যেখানে জাতীয়তাবাদ উগ্র রূপ ধারণ করে সীমানা ও পরিচয়ের দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করে, সেখানে সব্যসাচীর সীমানাহীন বিপ্লবের ধারণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে—মুক্তির কোনো ভূখণ্ডগত বা জাতীয় সীমানা থাকতে পারে না; মানুষের মুক্তি সর্বজনীন।
​
​সব্যসাচী মল্লিক কোনো রক্তমাংসের গতানুগতিক মানুষ কিংবা নিছক কাল্পনিক চরিত্র মাত্র নয়,সব্যসাচী মল্লিক বিশ্বজুড়ে চলা শোষণের বিরুদ্ধে চিরকালীন প্রতিবাদের এক জ্বলন্ত ভাষা। একবিংশ শতাব্দীর জটিল বৈশ্বিক রাজনীতি, পুঁজিবাদের আগ্রাসন এবং সীমানাভিত্তিক মানবিক সংকটের যুগে দাঁড়িয়ে সব্যসাচীর বিদ্রোহী সত্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব—যখন সমস্ত কৃত্রিম সীমানা ও ভেদাভেদ পেরিয়ে একটি সমতাভিত্তিক, অখণ্ড পৃথিবী গড়ে ওঠে। কারণ, ওই যে! যে যেখানেই লড়ে যাক আমাদেরই লড়া!

অন্যান্য প্রতিবেদন.