কালী মন্দিরের চাতাল থেকে আধুনিকতার ক্যানভাস, উনিশ শতকের কলকাতা এবং কালীঘাট পটচিত্র

১৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​উনিশ শতকের কলকাতার ইতিহাস কেবল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস নয়, এটি রূপান্তর, পুনর্জাগরণ এবং সাংস্কৃতিক সংঘাতের এক বর্ণময় অধ্যায়। সেই পরিবর্তনের ঘূর্ণাবর্তে যখন সনাতন গ্রামীণ বাংলার লোকশিল্প নাগরিক সভ্যতার পসরায় মিশে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই কলকাতার আদি বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা কালীঘাট মন্দিরের চত্বরে জন্ম নেয় এক নতুন দৃশ্যশিল্প—কালীঘাট পটচিত্র। ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানা ছাড়িয়ে যা একদিন হয়ে উঠেছিল সেকালের সমাজজীবনের এক জীবন্ত দলিল।
​
​ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে এই শিল্পকলার প্রাথমিক সূচনা ঘটেছিল মূলত তীর্থযাত্রীদের আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে। বাংলার পটুয়ারা প্রথাগত দীর্ঘ পটচিত্রের গণ্ডী ভেঙে কাগজ ও সস্তার জলরঙের মাধ্যমকে বেছে নেন। তাদের তুলির টানে মূর্ত হয়ে ওঠেন দেবী কালী, দুর্গা, শিব কিংবা রাধা-কৃষ্ণ।

কালীঘাটের পটচিত্রে হরগৌরী


​তবে এই দেব-দেবীর অবয়বে কোনো ক্ল্যাসিকাল বা ধ্রুপদী আভিজাত্য ছিল না; ছিল এক আদিম শক্তি, প্রাণবন্ত সাবলীলতা এবং চটজলদি তৈরি করার স্বতঃস্ফূর্ততা। তীর্থযাত্রীরা যখন কালীঘাট থেকে ফিরে যেতেন, তখন তাঁদের সঙ্গী হতো এই সস্তা অথচ দৃষ্টিনন্দন কাগজগুলো। দেবদেবী কেন্দ্রিক এই চিত্রগুলির মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের অন্তরের সহজিয়া ভক্তি ও বিশ্বাসের নিখাদ প্রকাশ ঘটেছিল নিখাদ ।
​
​কালের পরিক্রমায় যখন ব্রিটিশ প্রভাব এবং নবজাগরণের আলোয় কলকাতার বাবু সমাজ ও নব্য ধনী শ্রেণী নিজেদের শিকড় হারাতে বসেছিল, তখন কালীঘাট পটচিত্রের রূপকাররা নিলেন এক নতুন ভূমিকা। তাঁরা কেবল ভক্তের পূজারি রইলেন না, হয়ে উঠলেন সমাজের নিরপেক্ষ সমালোচক।


​কলকাতার নব্য বাবু সংস্কৃতির ভণ্ডামি, পচা সমাজব্যবস্থা এবং তথাকথিত আধুনিকতার খোলসে ঢাকা অবক্ষয়কে তাঁরা ফুটিয়ে তুললেন তুলির ব্যঙ্গাত্মক আঁচড়ে। ‘বাবু-বিবি’ সংস্কৃতির প্রতীকী চরিত্রগুলো—যাঁদের পরনে বিলাসি পোশাক, হাতে ফিনফিনে চাদর আর নেশাতুর চোখ—তাদের চালচলন এবং নৈতিক পতনকে অসাধারণ রসবোধের সাথে তারা ফুটিয়ে তুললেন ।
​ সেকালের সমাজেও নারীদের ওপর নানা নির্যাতন এবং বাবুদের রক্ষিতা সংস্কৃতির চিত্র অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পটুয়ারা তুলে ধরেছিলেন।

বাবু-বিবি সংস্কৃতি কালীঘাটের পটচিত্র

​দেবদেবীর আরাধনা থেকে শুরু করে বাবু সমাজের বিদ্রূপ—এই দুইয়ের পাশাপাশি কালীঘাট পটচিত্রের ক্যানভাসে ঠাঁই পেয়েছিল সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবন। কাঠুরিয়ার কাঠ কাটা, ধোপার কাপড় কাচা, কিংবা সমসাময়িক আলোচিত অপরাধ বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা (যেমন প্রখ্যাত ‘এলোবেশি’ মামলা)—সবকিছুই নিমেষে জায়গা করে নিত পটুয়াদের কাগজে।


​এই শিল্প হয়ে উঠেছিল নিখাদ বাংলার দৃশ্যকাব্য। কলকাতার নাগরিক জীবনের কোলাহল, পরিবর্তনশীল অর্থনীতি এবং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন—সবকিছুই এই চিত্রকলার আড়ালে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল। দ্রুত ব্রাশের টান এবং সাহসী রঙের ব্যবহার এই শিল্পকে দিয়েছিল এক অনন্য আধুনিক ও মিনিমালিস্ট রূপ, যা আজকের আধুনিক শিল্পীদেরও সমানভাবে অনুপ্রাণিত করে।

​কালীঘাট পটচিত্র কেবল উনিশ শতকের বাংলার একটি মৃত অতীত নয়; এটি আমাদের স্বত্বা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক দীপ্তমান শিখা। সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক জীবনের সাথে যুক্ত করে বাঁচিয়ে রাখার কাজটিই অত্যন্ত সার্থকভাবে করে চলেছে ‘আর্টস ক্যালকাটা’।
​ঐতিহাসিক কলকাতার সেই প্রাণশক্তি, যা একদিন মন্দিরের চাতাল থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাকে ঘরের কোণে ফিরিয়ে আনছে আর্টস ক্যালকাটা। প্রাচীন পটচিত্রের মূল চেতনাকে অটুট রেখে যখন তা আজকের সমকালীন অন্দরসজ্জা বা লাইফস্টাইলে জায়গা করে নেয়, তখন অতীত ও বর্তমানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়। কালীঘাট চিত্রকলার এই পুনরুজ্জীবন আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় যে, শিল্পের আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে মানুষের জীবনের সুখে-দুঃখে, হাসিকান্নায় ও পরিবর্তনের প্রবহমানতায়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.