কে কী খাচ্ছে সেটা বড় বিষয় নয়, কে খেতে পাচ্ছে না, সেটাই দেখার বিষয়!

৫১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

এই যে চারিদিক থেকে এত নিরামিষ নিরামিষ কথাবার্তা হচ্ছে তার উদ্দেশ্য কী? রাজধানী দিল্লিতে আন্তর্জাতিক ব্রিকস সম্মেলন হচ্ছে সেখানেও বিদেশি অতিথিদের জন্য নিরামিষ খাবারের বন্দোবস্ত তার কারণ কী? কোন কার্যকারণ ছাড়াই কি এগুলো হচ্ছে নাকি এর পেছনে একটা সূক্ষ্ম নিরামিষ চাপানোর রাজনীতি আছে? মধ্যপ্রদেশের হিন্দি ভাষী বাগেশ্বর বাবা বাংলায় এসে দুর্গা পুজোর সময়ে বাঙালিকে আমিষ খাওয়ার নিদান দিয়েছেন বলে খুব হইচই হচ্ছে। জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে। তারই মধ্যে রাজধানী দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্ব নেতাদের জন্য কঠোরভাবে নিরামিষ পদের ব্যবস্থাপনা করেছে আয়োজক দেশ ভারত।

কথা উঠছে একজন অতিথিকে আপ্যায়ন করে নিয়ে এসে তার খাবারে রুচি সম্বন্ধে না জেনে কেন এটা করা হলো? যেকোনো সময় বাড়িতে কোনো অতিথিকে ডাকলে দেখতে হয় যে সেই অতিথি কী ধরনের খাবার খেতে ভালোবাসেন। তাকে প্রশ্ন করে নিতে হয় তুমি কি এই মাছ খাও তুমি কি চিকেন খাও না মাটন খাও। তিনি যদি বলেন তিনি নিরামিষ খান তিনি মাছ মাংস কিছুই খান না তবে তার জন্য নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এবার ব্রিকসের সম্মেলনে অতিথিদের ডেকে এনেছে ভারত, ডেকে এনে নিজের পছন্দের মত খাবার সাজিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো সোনা মুখ করে খেয়ে নিয়েছেন কিছু বলেননি কিন্তু বিষয়টায় যে দেশের সম্মান নষ্ট হয় সেই কিন্তু শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীদের নেই।

সেই গল্পটার কথা মনে পড়ে গেল বক আর শিয়ালের কথা। বক শিয়ালকে বাড়িতে ডেকে এনেছে, একটা সরু মুখের কলসি দিয়েছে যাতে সেখান থেকে শিয়াল খেতে পারে শিয়াল তো খেতেই পারছে না। শেয়াল কোনোমতে ধন্যবাদ ধন্যবাদ করে বাড়ি গেছে। বককে নিমন্ত্রণ দিয়ে গেছে তার বাড়িতে যেতে। এবার কিছুদিন পরে বক গেছে শিয়ালের বাড়ি এবার শিয়াল বককে খেতে দিয়েছে একটা চওড়া থালাতে। এবার বকের সরু ঠোঁট দিয়ে সেই থালার থেকে কিছু খেতে পারছে না। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে যদি চীনের রাষ্ট্রপতি তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে সাপ ব্যাঙ গরু ছাগল সব দিয়ে দেয়। তখন কী হবে?

ওদিকে রাহুল গান্ধী একটা মজার জিনিস করেছেন। এবার ভক্তগণ রাহুল গান্ধীকে গালাগালিও দিতে পারছে না হজমও করতে পারছে না। রাহুল গান্ধী সামাজিক মাধ্যমে যে পোস্টটি করেছেন তা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে করা হয়েছে। রাহুল গান্ধী লিখেছেন “ভারতীয় আমিষ খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু ঠিক যেমন আমার বোনের হাতের ছোলে বাটুরে”। ব্রিকসের সম্মেলনের খাবারকে উদ্দেশ্য করেই যে এই পোস্ট তা স্পষ্ট হয়ে গেছে রাজনৈতিক মহলের তরজার মধ্যেও। কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা, রাহুলের সুরেই আক্রমণ করেছেন কেন্দ্রকে। তার অভিযোগ কেন্দ্রের বিজেপি সরকার দেশের সাধারণ মানুষ যারা মূলত আমিষাশী, তাদের ওপর নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয় সেই একই কায়দায় তারা বিদেশি অতিথিদের জন্য তাদের নিজেদের অপছন্দ ও পছন্দ চাপিয়ে দিচ্ছে। পবন খেরা বলেছেন ভারতের রন্ধনশৈলীতে বিশ্বের সেরা কিছু আমিষ পদ রয়েছে। অথচ সরকার আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেগুলিকে তুলে ধরার সুযোগ থেকে নিজেদেরও বঞ্চিত করেছে দেশকেও বদনাম করেছে।

অবশ্যই বিজেপিও ছেড়ে কথা বলেনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজিজু , এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন আপনি বিশ্বাসই করতে পারছেন না বিশ্বের নেতাদের জন্য খাবারের যে মেনু রাখা হয়েছে , তা নিয়ে নাকি কংগ্রেস রাজনীতি করতে পারে। কিন্তু রাজনীতি কে করছে? সেটা কি বোঝা উচিত নয়? এবার কারো কারো পছন্দ হয়নি তারা সযত্নে এড়িয়ে নিজের হোটেলে গিয়ে নিজেদের পছন্দমত খাবার খেয়েছেন। মুখে কথা বলেন নি কিন্তু এড়িয়ে গেছেন। এটা হচ্ছে ভদ্রতা। কিন্তু তারা ভদ্রতা করে এড়িয়ে গেলেও এই বিতর্ক থামছে না এবং আগামী দিনেও থামবে না।

খুব সূক্ষ্মভাবে একটা জিনিস প্রচার করা হচ্ছে, ভারতবর্ষের মানুষ নাকি জন্ম থেকেই নিরামিষ খেতে অভ্যস্ত। কিন্তু তথ্য পরিসংখ্যান কী বলে? সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে যদি এই বাংলায় নিরামিষের প্রচলন করতে হয় আমিষের বদলে তাহলে শতকরা ৯৯ জনের পাত থেকে মাছ মাংস কেড়ে নিতে হবে। ভারতেও ১৫ বছরের বেশি বয়সী যে কোন মানুষের প্রায় বেশিরভাগই আমিষাশী। যেটা রাহুল গান্ধী ও বলেছেন। প্রায় ৭১% মানুষ আমিষ খেয়ে থাকেন নিয়মিত। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ যে সার্ভে করেছে তার রিপোর্ট বলছে দেশের ১৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী পুরুষদের প্রায় ৮৩.৪ শতাংশ মানুষ এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের প্রায় ৭৯.৬% মানুষ আমিষ খান। সপ্তাহে একদিন অন্তত আমিষ খান গড়ে প্রায় প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ। শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের সার্ভের ছবিটা প্রায় একই রকম। ভারতের প্রাপ্তবয়স্কদের মাত্র ৩৯ শতাংশ মানুষ নিজেদের নিরামিষাশী বলে পরিচয় দেন। সেখানে হয়তো আলাদা করে পশ্চিমবঙ্গের তথ্য নেই কিন্তু পূর্বাঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে নিরামিষাশীর হার মাত্র ১৮ শতাংশ। এই সমীক্ষাতেই দেখা গেছে হিন্দুদের মধ্যে মাত্র ৪৪ শতাংশ মানুষ নিরামিষাশী। প্রচার আছে জৈনরা সবাই নিরামিষাসী কিন্তু তার মধ্যেও দেখা গেছে ৮% মানুষ আমিষ খেয়ে থাকেন। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে যথাক্রমে ৮ ও ১০ শতাংশ মানুষ মাত্র নিরামিষাশী। বাঙালির খরচের খাতার দিকেও যদি হিসাব নেওয়া যায় তাহলেও দেখা যাবে তাদের মোট খাদ্যব্যয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ ব্যয় হয় ডিম মাছ মাংস ইত্যাদি আমিষ খাবারের পিছনে। হাউজহোল্ড কনসাম্পশন এক্সপেনডিচার সার্ভের হিসেব বলছে কেরালা এবং বাংলা আমিষ খাবারের পিছনে বেশি খরচ করে। শহুরে বাঙালি মাথাপিছু প্রায় ১ কেজি মাছ মাংস খান প্রতি মাসে। তবে সর্বভারতীয় গড় সেখানে শহরে মাত্র আড়াইশো গ্রাম।

এই মাছ মাংস উৎপাদন ডিম উৎপাদন তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষের রুজি রোজগারের প্রশ্ন। সুতরাং বাঙালিকে আমিষ থেকে নিরামিষ বানাতে হলে এই মানুষগুলো কাজ হারাবেন। যে জাতীয় জনগণনা চলছে তাতেও এই ধরনের প্রশ্ন থাকা উচিত ছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এই ধরনের প্রশ্নের বদলে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য হস্তগত করাটাই উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে। তাই আধার নম্বর ভোটার কার্ডে নাম আছে নাকি ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে ভরা হয়েছে জনগণনার প্রশ্নপত্র। মানুষ খেতে পাচ্ছে কি না পাচ্ছে সেই প্রশ্নের পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে অন্যান্য অকিঞ্চিৎকর প্রশ্ন।

সারাদেশে তাহলে কেন এই নিরামিষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা? দেশের গো বলয় অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিমবঙ্গে মধ্যাঞ্চল সেটাই বিজেপি আরএসএস এর মূল ঘাঁটি। সেখানে আমিষের জন্য খরচ তাদের নিতান্তই নগণ্য। উত্তর প্রদেশে মূলত দলিত ও মুসলমানরা আমিষ খাওয়ার খেয়ে থাকেন। ওই রাজ্যগুলোতে মূলত দুগ্ধজাত খাবার বেশিরভাগ মানুষ খেয়ে থাকেন যা বাংলার ঠিক উল্টো। কিন্তু এটাই ওদের কাছে পুরো ভারতবর্ষ । এটাই আসল হিন্দুত্ব। সেই হিন্দুত্বের খাবার সারা ভারতবর্ষে চাপানোর চেষ্টার মধ্যে দিয়েই আসলে হিন্দু রাষ্ট্র আসবে এটা আরএসএস বিজেপির মানুষজন বিশ্বাস করে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মোহন ভাগবত আরএসএস এর যিনি মুখ্য মুখ, বলেছিলেন খাদ্যাভ্যাস কারোর উপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয় কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা সম্ভব। আজকে তিনি নিউইয়র্কে গিয়েও একই কথা বলছেন ভারত নাকি বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ কোনো ধর্ম কোনো খাদ্যাভ্যাস এর ওপর কোন একটি সংখ্যাগুলোর মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয় কিন্তু তা সত্ত্বেও খেয়াল করতে হবে তার পরের কথাটি। সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণের দাবির কথা কিন্তু সেদিনও তিনি বলেছিলেন আর তার হয়ে আজকে একই কথা ওই বাগেশ্বর বাবা কিংবা অন্যান্য আরএসএস-এর লোকজন বলে থাকেন। অন্য একটি সভায় এই মোহন ভাগবতকে তাই বলতে শোনা যায় যেহেতু উৎসবের সময় নিরামিষ খাবার স্বাভাবিক তাই তার বাড়ির সামনে কিম্বা মন্দিরের সামনে যদি অন্য কেউ আমিষ খান তাহলে তার ভাবা বেগে আঘাত লাগতে পারে। খেয়াল করে দেখুন বাগেশ্বর বাবাও কিন্তু একই কথাই বলেছেন। মোহন ভাগবতের কথার সূত্র ধরে বলা যায় নিরামিষ খাওয়া মানুষদের অনুভূতিতে আঘাত লাগলে আইন করে আমিষ খাওয়া বন্ধ করার প্রকল্প নিতে পারে সরকার। সুতরাং দূর্গা পুজোয় বা অন্যান্য বাঙালির উৎসবে সবার উচিত আমিষ খাওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা। গতকাল যা সারা ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল আজকে কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাতেও যে একই ধরনের নিয়ম নীতি চালু হতে পারে তার ইঙ্গিত কিন্তু সেদিন মোহন ভাগবত দিয়ে দিয়েছিলেন। আসলে মোহন ভাগবতও জানেন আজকে হিন্দুত্ববাদীদের মূল পৃষ্ঠপোষক যারা সেই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিন্তু নিরামিষাশী। তাদেরকে তাই তুষ্ট রাখতে হবে সেটা যেমন নরেন্দ্র মোদী জানেন মোহন ভগবত জানেন তেমনি শুভেন্দু অধিকারীকেও জানতে হবে। তাই শ্রাবণ মাসে, কিংবা নবরাত্রিতে কিংবা হিন্দুদের অন্যান্য যেকোনো উৎসবে নিরামিষ খেতে হবে আর আমিষ যদি খেতেই হয় তাহলে সেটা নির্দিষ্ট দিনে খেতে হবে। এই করে করেই আসলে মানুষের অভ্যাসের পরিবর্তন করা সম্ভব সেটা বিজেপি এবং আরএসএস মনে করে। কিন্তু ভারতবর্ষের মতো দেশে কি সেটা সম্ভব আইন করেও কি সম্ভব সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

ভারত “এক ঈশ্বর, এক ভাষা, এক খাবার” নীতিতে চলে না। ভারতে ১৯,৫৬৯টি মাতৃভাষা, ১২১টি ভাষা। ২২টি তফসিলি জাতি। বহু ধর্ম এবং স্থানীয় দেবতা। আমিষ ও নিরামিষ উভয় ধরনের সম্পূর্ণ ভিন্ন রন্ধনশৈলী। বৈচিত্র্য আমাদের স্লোগান নয়,
এটি আমাদের জীবন যাপনের অঙ্গ। তাই একেশ্বরবাদকে বিদায় জানানোটাই কাজ। ভারত সাংস্কৃতিক অর্থে একেশ্বরবাদের ধারণা, অর্থাৎ এক ঈশ্বর, এক ভাষা, এক ধরনের খাবারকে প্রত্যাখ্যান করে। দেশটি এতটাই বৈচিত্র্যময় যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে তাকে খাপ খাওয়ানো যায় না। খাবার অভ্যাসের ব্যাপারে যারা সংখ্যালঘু তারা যদি তাদের অভ্যাসটাকে সংখ্যা গুরুর উপর চাপাতে আসে তাহলে কিন্তু এত সহজে সেই সংখ্যাগুরু বিষয়টা মেনে নেবে না। কোন কিছুই জোর করে আসলে চাপিয়ে দেওয়া যায় না আইন করেও নয়, মেরে ধরে তো নয়ই। ২০২৫ সালের ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান ১২৩ টি দেশের মধ্যে ১০২ নম্বর। সেখানে কে কী খাচ্ছের থেকেও বড় হওয়া উচিত কারা খাচ্ছে কারা খাচ্ছে না সেই দিকে নজর দেওয়ার। দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেই দিকে নজর না দিয়ে কী করে মানুষের উপর নিরামিষ চাপানোর আইন করা যায় তা নিয়ে ভাবিত বেশি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.