পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ এখন৷ ধর্মের অসুখ৷ আর এই ধর্মের অসুখ যখন যখন যেখানে যেখানে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে তখন তখন সেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে সংখ্যালঘুর ওপর সংখ্যাগুরুর অত্যাচার৷ কখনো সেই সংখ্যালঘুর নাম প্যালেস্তাইন কখনো সেই সংখ্যালঘুর নাম রোহিত ভেমুলা আর কখনো তার নাম চিন্ময় কৃষ্ণ দাস৷
গত বৃহস্পতিবার সকালে ৭২ বছর বয়সে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর শ্রীশ্রী পুণ্ডরীক ধাম আশ্রমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা সন্ধ্যা রানি ধর। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারসহ নানা জটিল শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা এই প্রবীণা জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও ছেলের মুখ দেখতে পাননি। পরবর্তীতে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন তাকে শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য মাত্র ৫ ঘণ্টার প্যারোলে কারামুক্তির নির্দেশ দেয়।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং জাতীয় পতাকাকে অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার হন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একে একে হত্যা, হামলা ও ভাঙচুরের মতো গুরুতর ধারায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে হাইকোর্ট থেকে জামিন মিললেও, অন্যান্য গুরুতর মামলার (যেমন সরকারি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলা) জট পুরোপুরি কাটেনি। মায়ের অসুস্থতার শেষ দিনগুলিতে ও মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে প্যারোলে মুক্তির জোরালো আবেদন করা সত্ত্বেও মেলেনি অনুমতি৷
বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের উত্থান এবং ‘সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট’-এর ব্যানারে সংগঠিত আন্দোলন এক নতুন রাজনৈতিক ধারার জন্ম দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের দাবিতে এই আন্দোলন দ্রুত জনসমর্থন অর্জন করে। তবে এর সমান্তরালে রাষ্ট্রে এক তীব্র মেরুকরণ লক্ষ্য করা গেছে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি হিসেবে তাঁর গ্রেফতার এবং পরবর্তীতে তার অনুগামীদের বিক্ষোভ ও তার জেরে ঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বারবার নাড়া দিয়েছে।

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রকাশিত হয় তার বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও মানবিক সংবেদনশীলতার মাধ্যমে। কিন্তু বারবার জামিন লাভ সত্ত্বেও নতুন নতুন মামলায় বন্দিদশা দীর্ঘায়িত হওয়ার ঘটনা জনমনে এই ধারণাই শক্তিশালী করে যে, আইনি প্রক্রিয়াগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত হয়। চিন্ময়কৃষ্ণের মায়ের শেষ ইচ্ছা অপূর্ণ থাকা এবং মৃত্যুর পর কড়া পুলিশি পাহারায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের অনুমতি পাওয়ার ঘটনাটি বিচারব্যবস্থার সেই অমানবিক ও যান্ত্রিক রূপটিকেই উন্মোচন করে।
একদিকে যখন সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে চরম আস্থার সংকটে ভুগছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সংখ্যাগুরুর একটি অংশের ভেতর ভিন্নমত ও আন্দোলনকে কঠোরহস্তে দমনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।চিন্ময়কৃষ্ণের কারাবাস এবং তাঁর ওপর অর্পিত আইনি জটিলতা সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক উত্তেজনারই একটি অংশ, যেখানে একজন সাধারণ মায়ের বুকফাটা আর্তনাদও রাজনীতির নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যায়।

