রকমারি কাঠের রথেই মিলে যায় শৈশব, প্রাচীন মন্দিরশৈলীর মর্যাদা নেই, আছে এগিয়ে চলার খুশি

৩৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

‘জল ঠেলে যায় রথের চাকা মেঘ ছুঁয়েছে ঈদের মিনার
এক পাড়াতেই ভিজতে থাকা ছোট্ট ইমন, আর সাবিনা
ওদের খুশি এক পথে যাক বর্ষাকালের পিছল ছাদে
যখন সবার স্বপ্ন ভেজা, রথের দড়ি লাগুক চাঁদে।’

শ্রীজাত

রথের সঙ্গে বাঙালিদের শৈশবের যোগ অনেক প্রাচীন। ‘রথ টানলেই দুগ্গা আসে’ এই বিশ্বাস প্রতিটি শিশুই বুকে মাথায় নিয়েই বড় হয়। জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা নিয়ে হাজারো নিয়ম কানুন, পূরাণ, লোককথা, বিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু ছোট ছোট কাঠের রথ সাজিয়ে নিয়ে বিকেল বেলা বেরোনোর আনন্দ এর থেকে পৃথক। এতে নেই ধর্মীয় বিধি – নিষেধ, নেই ছোঁয়াছুঁয়ির ভাগাভাগি। এই রথের চাকা গড়ানোর আগে কোনও সোনার ঝাড়ু দিয়ে ঝাঁট দেওয়ার রীতি নেই, নেই ভগবানকে ৫৬ ভোগ দেওয়ার তাড়া, মন্ত্রের ঝঙ্কার নেই, নেই জনপ্লাবন- আছে কেবল শিশু কিশোর কিশোরির রথ সাজিয়ে বের হওয়ার অনাবিল উচ্ছ্বাস। কাসর, ঘণ্টা বাজিয়ে বাড়ির পাশের রাস্তায় রথ নিয়ে বের হলে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার জুটে যায় কখনও গুঁড়ের বাতাসা, কখনও বা ১০টা টাকা।

রিমোট কন্ট্রোল, রেসিং কারের যুগে এই হাতে টানা কাঠের রথ কেনার আগ্রহ ছিল অন্যরকম। ফুল, আলো দিয়ে রথ সাজানোর পর রথ নিয়ে বেরোনোর ‘বায়না’ আজও বাঙালি শিশুদের উইশলিস্টে থাকে। এই রথের মধ্যে দিয়েই পূর্ণতা পেতো সৃজনশীলতা। কাঠের রথে থাকতো নকশা কাটা। মন্দির তৈরির শৈলীই ফুটে উঠত ১ হাত রথের উপর। তবে কালের নিয়মে কাঠের রথের সেই সৃজনশীলতা ঢেকে গিয়েছে রঙ-বেরঙের সেলোফিনে। বিক্রিও কমেছে কাঠের রথের৷

কাঠের খেলনা রথ

কিন্তু তবুও কিছু শিল্পীরা মনে করেন সময়ের সঙ্গে তাল মেলানো নয়, নিজেদের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখাই সময়ের দাবি। আজও কিছু রথকার রয়েছেন যারা শিশুদের জন্য নির্মিত ছোট রথেই যত্ন করে এঁকে দেন নকশা। বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের এমনই দুই রথকার তপন ও স্বপন শীল। চকবাজার বাহাদুরগঞ্জ সূত্রধর পাড়ার এই দুই ভাই বাবার রথ তৈরির ছাপ রেখে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত তাঁদের শিল্পকর্মে৷ শিরীষ, আম, চাকলদা, আকাশমণি কাঠ ব্যবহার করে ছোট বড় নানান আকারের রথ গড়েন তারা৷ বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যশালী পোড়ামাটির মন্দিরের আদলে রথ নির্মাণ করেন তারা। কোনও রথের উচ্চতা হয় ১ ফুট, কোনওটার বা সাড়ে ৩ ফুট। এই রথের চাকা আর ঘোড়া হয় কাঠের। ঘোড়ার ভঙ্গিমা হয় উদ্যত।

মহিলাদের হাতে তৈরি রথ

কলকাতার গিরিশপার্কে আজও রয়েছে আস্ত একটি রথপাড়া৷ সেখানকার কারিগররা এখনও বানিয়ে চলেছেন কাঠের এই ছোট বড় রঙিন রথগুলি। রথ এলে আজও ভিড় বাড়ে এই পাড়ায়। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটালের আরগোড়া এলাকায় প্রামাণিক বাড়ির মহিলারা নিজে হাতেই বানান এই কাঠের তৈরি রথ। প্রায় ৪৫ বছর ধরে এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আসছে প্রামাণিক পরিবার৷ নদিয়ার ফুলিয়াতেও তালতলার বাসিন্দা রবীন্দ্র সূত্রধর বংশপরম্পরা মেনে বানিয়ে আসছেন রথ। বিষ্ণুপুরের রথের মতো সেটি অর্ধগোলাকার নয়, ফুলিয়ার এই রথের খিলান হয় ত্রিকোণাকৃতি। রথের একদম উপরের চূড়ায় আঁকা হয় জগন্নাথের তিলক এবং চক্ষু। অন্যদিকে ফুলিয়ার মায়া সূত্রধরের নির্মিত রথের প্রধান আকর্ষণ হল আলপনা।

রবীন্দ্র সূত্রধরের বানানো রথ (ছবি: শুভঙ্কর দাস)

বাংলায় পালা বদলের পর ঐতিহ্যবাহী রথগুলিকে ৫ লক্ষ টাকার অনুদান ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। কিন্তু এই শিল্পীদের ভরসা সেই বায়নাখোকারাই। তাঁদের রথ দেশ বিদেশে সমাদৃত নয়, কিন্তু বাঙালিদের ছেলেবেলা বাঁচিয়ে রাখার কান্ডারী তারাই। যেকোনও কিছুই হারিয়ে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাওয়া সময়ের দাবি, কিন্তু তা টিকিয়ে রাখা তাগিদ- যা করে চলেছেন এই বাংলার এই রথ নির্মাতারা।

অন্যান্য প্রতিবেদন.