মেঘে ঢাকা পড়া তারাটির নাম নীতা

৩৫ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​”মানুষের অবক্ষয় আমাকে আকর্ষণ করে। তার কারণ এর মধ্য দিয়ে আমি দেখি জীবনের গতিকে, স্বাস্থ্যকে। আমি বিশ্বাস করি জীবনের প্রবহমানতায়। আমার ছবির চরিত্ররা চিৎকার করে বলে আমাকে বাঁচতে দাও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে বাঁচতে চায়—এ তো মৃত্যু নয়, জীবনেরই জয়ঘোষণা।”
— ঋত্বিক ঘটক (প্রসঙ্গ: মেঘে ঢাকা তারা)


​ঋত্বিক ঘটকের মাস্টারপিস মেঘে ঢাকা তারা চলচ্চিত্রে নীতার প্রেমিক সনত তাকে দেখেছিল একটি মেঘে ঢাকা তারা হিসেবে—যে তারাটি চারপাশের হাজারো সমস্যার মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। নীতা আমাদের চিরচেনা সেই চরিত্র, যার কাছে নিজের সুখের চেয়ে অন্যের প্রয়োজন সবসময় মুখ্য হয়ে ওঠে। টিউশনির কষ্টের টাকা দিয়ে নিজের ছেঁড়া চটিজোড়া বদলানোর কথা সে ভাবে না; বরং বোন গীতাকে নতুন শাড়ি, ছোটভাই মন্টুকে ফুটবল খেলার বুট আর দাদা শংকরকে পাঞ্জাবির কাপড় কিনে দিয়ে সে নিজের সব সঞ্চয় নির্দ্বিধায় শেষ করে দেয়। নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়ে সে বাঁচিয়ে রাখতে চায় অন্যদের স্বপ্নগুলো। দাদা শংকর যখন সমাজের চোখে অপদার্থ ও সমালোচিত, তখনো নীতা তার গায়ক হওয়ার স্বপ্নটিকে প্রাণপণে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে।

মেঘে ঢাকা তারা র একটি দৃশ্য


​’নীতা’ কেবল একটি কাল্পনিক চরিত্র নয়, সে যেন এক জীবন্ত দলিল। যে দৃশ্যে নীতা তার ভাই শঙ্করের সঙ্গে গলা মিলিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গায়— “যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক…”—ঠিক সেই মুহূর্তেই ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠা চাবুকের শব্দ  দর্শকের মনস্তত্ত্বে এক তীব্র আঘাত হানে। এটি নিছক কোনো শব্দপ্রয়োগ বা সাউন্ড এফেক্ট নয়; এটি সেই নিষ্ঠুর সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক, যা একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্মরতা নারীর সমস্ত ব্যক্তিগত সুখ, স্বাস্থ্য ও স্বপ্নকে তিলে তিলে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।


​ রবীন্দ্রসংগীতের শান্ত, স্নিগ্ধ সুরের সঙ্গে অতর্কটে বেজে ওঠা চাবুকের শব্দের এই ব্যবহার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা যোগ করে। নীতা হাসিমুখে গান গাইছে ঠিকই, কিন্তু তার জীবনের ওপর সমাজ ও অভাবের চাবুক নিয়মিত পড়ে চলেছে। পরিবারকে বাঁচাতে সে নিজের সমস্ত ইচ্ছেকে হত্যা করেছে। এই সাউন্ড মোটিফ দর্শকের অবচেতনে এক অদ্ভুত যন্ত্রণার সৃষ্টি করে, যা বুঝিয়ে দেয় নীতার এই আত্মত্যাগ কোনো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মহৎ কাজ নয়; বরং এক নিষ্ঠুর সামাজিক ব্যবস্থার বাধ্যবাধকতা, যা তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।


​নীতা চরিত্রটি বিশ শতকের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের এক নির্মম ট্র্যাজেডির মূর্ত প্রতীক। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় গড়া সমাজ নীরবে নারীর এই আত্মত্যাগকে স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নেয়। নীতার পরিবার তার উপার্জনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হলেও ভালোবাসার বেলায় তারা পুরোপুরি উদাসীন।
​এই লাগাতার মানসিক ও পারিবারিক চাপ ধীরে ধীরে নীতাকে গ্রাস করে। তার অসুস্থতা ও কাশির সঙ্গে রক্ত ওঠা আসলে তার অবদমিত মানসিক যন্ত্রণা এবং যূপকাষ্ঠে বলিদানেরই শারীরিক রূপান্তর। সুপ্রিয়া দেবী তাঁর অসামান্য চোখের ও শরীরের ভাষায় এই দীর্ঘস্থায়ী নিঃশব্দ কষ্টকে রূপোলি পর্দায় অমর করে রেখেছিলেন।​

‘মেঘে ঢাকা তারা’-র একটি দৃশ্য


“দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম। আমি যে বাঁচতে বড় ভালবাসি। দাদা, আমি বাঁচব। দাদা, আমি বাঁচব।”- ​পাহাড়ের গায়ে গায়ে ধ্বনিত হতে থাকা নীতার বেঁচে থাকার এই  আকুতি বারবার আমাদের মনে সমাজের সমাজের স্বার্থ,দায়,তাগিদ আর পোস্ট-মর্ডান তৃতীয়বিশ্বের সকরুণ আর্থসামাজিক অপারগতার কথা৷

  গীতার বিয়ের দৃশ্যের ঠিক আগে নীতার শয্যাশয়ী বাবা আকুল হয়ে বলে ওঠেন:
​”সেকালে মাইনষে গঙ্গা যাত্রীর গলায় ঝুলাইয়া দিতো মাইয়া, তারা ছিল ‘বর্বর’। আর একালে আমরা শিক্ষিত, সিভিলাইজড। তাই লিখাপড়া শিখাইয়া মাইয়ারে নিংড়াইয়া, ডইল্যা, পিষ্যা, মুইছা ফেলি তার ভবিষ্যৎ। ডিফারেন্সটা এই।”- এই মেঘে ঢাকা তারার সারাংশ৷ ​এই ধূলোকাদা  পৃথিবীর সমস্ত ক্ষুদ্রতাকে পায়ে দলিয়ে  ভালোবাসার ছায়াঘন বনে আকাশভরা বৃষ্টি নামায় নীতারা৷ আর নিজে হয়ে ওঠে এক চিরকালের “মেঘে ঢাকা তারা”।

অন্যান্য প্রতিবেদন.