বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

“নেতাজি আমার হৃদয়ে”— ব্রিটিশ নির্যাতনের মুখে নীরা আর্যের শেষ জবাব

৩৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট। গভীর রাতে নিদ্রিত ভারত জেগে উঠেছিল।দীর্ঘ দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। ইতিহাসের এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণে যেন ভারতমাতা নতুন করে পরেছিলেন স্বাধীনতার বসন।
রেডিওর তরঙ্গে ভেসে আসছিল পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কণ্ঠ। কোথাও আলো জ্বলছিল, কোথাও পতাকা উঠছিল, কোথাও মানুষের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে ভারতবর্ষের আকাশে অবশেষে সূর্য উঠেছে।কিন্তু সেই একই রাতে এই দেশেরই অন্য প্রান্তে লেখা হচ্ছিল সম্পূর্ণ অন্য এক ইতিহাস। স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম নিয়েছিল বিভক্ত ভূখণ্ডের দীর্ঘশ্বাস।দেশভাগের করুণ কান্না। ঘর ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ানোর আতঙ্ক।


পরিচিত মাটি, পরিচিত উঠোন, পূর্বপুরুষের ভিটে—সবকিছুকে পিছনে ফেলে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে মানুষের অন্তহীন যাত্রা।পাঞ্জাব ও বাংলার বুকের উপর দিয়ে টানা হল একটি সীমারেখা। র‍্যাডক্লিফের সেই রেখা কেবল মানচিত্রের উপর টানা কালির দাগ ছিল না। সেই রেখার দু’পাশে ছিন্ন হয়ে গেল পরিবার, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মানুষ, ভেঙে গেল ঘর।
স্বাধীনতার উচ্ছ্বাসের পাশেই শুরু হল উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘ মিছিল, সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং রক্তমাখা বাস্তবতা।স্বাধীনতা এসেছিল। কিন্তু তার পথ ছিল রক্তে ভেজা।

স্বাধীনতার ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আমরা সাধারণত কয়েকটি পরিচিত নামই দেখি—গান্ধী, নেতাজি, নেহরু, সর্দার প্যাটেল, ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি যুদ্ধেরই কিছু ছায়ামানুষ থাকে। তাঁরা থাকেন পর্দার আড়ালে।তাঁদের হাতে কখনও পতাকা থাকে না, মঞ্চ থাকে না, সভাস্থলের মাইক্রোফোন থাকে না। কখনও তাঁদের হাতে থাকে একটি গোপন বার্তা।কখনও একটি ছদ্মনাম। কখনও একটি পিস্তল।
সেই বিস্মৃত ইতিহাসেরই এক নারী—নীরা আর্য। নেতাজির গুপ্তচর হিসেবে যাঁর নাম পরবর্তীকালে বহু লেখায় উঠে এসেছে। তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা গুপ্তচর বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর জীবনকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনির সব বিবরণ সমানভাবে প্রামাণ্য নয়। কিন্তু তাঁর নিজের বক্তব্যে উঠে আসা কিছু স্মৃতি এতটাই নির্মম, এতটাই মর্মস্পর্শী যে, সেগুলি শুনলে স্বাধীনতার ইতিহাসকে আর কেবল একটি উৎসবের ইতিহাস বলে মনে হয় না। মনে হয়—স্বাধীনতারও এক গভীর ক্ষত আছে।

ওই সময়ে ভারতীয় নারীর অধিকার বলে কি কোনও বস্তু ছিল? এরকম একটা সময় তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন এক পথ, যার শেষ প্রান্তে ছিল কারাগার, নির্যাতন কিংবা মৃত্যু। যে নারী তাঁর—ব্যক্তিগত জীবনকেই বানিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র। তাঁর স্বামী শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস ব্রিটিশ সিআইডি বিভাগে কাজ করতেন। তিনি চেয়েছিলেন নীরা যেন নেতাজিকে হত্যা করে। নীরা রাজি হয়নি। সামনে ছিল এক অসম্ভব কঠিন দ্বন্দ্ব। নীরাকে নেতাজির সব গোপন তথ্য ফাঁস করার হুমকি দেন শ্রীকান্ত। একদিকে স্বামী। অন্যদিকে দেশ। একদিকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টান। অন্যদিকে স্বাধীনতার শপথ।নীরা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। তাতেও সুবিধা করতে না পেরে নেতাজিকে গুলি করার চেষ্টা করেন তিনি নিজেই। সেই যাত্রায় বেঁচে যান নেতাজি। কিন্তু মৃত্যু হয় তাঁর গাড়িচালকের। নেতাজিকে হত্যার চেষ্টা করেছে স্বামী। শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারেননি নীরা। স্বামীকে বুকে ছুরি মেরে খুন করেন নীরা।

দেশের কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বিসর্জন দিয়ে নীরা আজাদ হিন্দ বাহিনীকে বাঁচিয়েছিলেন—বেছে নিয়েছিলেন নেতাজির আদর্শ। বেছে নিয়েছিলেন সেই রক্তরাঙা পথ, যার পরিণতি সম্পর্কে তিনি জানতেন। আর তার পরিণাম যা হওয়ার, তাই হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে নিয়ে যায় ব্রিটিশদের হাতে। তারপর শুরু হয় নির্যাতন। অকথ্য নির্যাতন।
কিন্তু এই গল্পের আসল মেরুদণ্ড শুধু নির্যাতন নয়। এই গল্পের আসল মেরুদণ্ড—একজন নির্যাতিতা আর একজন গুপ্তচরের দ্বন্দ্ব। একজন গুপ্তচর ধরা পড়লে কী করবেন? কতটা যন্ত্রণা সহ্য করলে একজন মানুষ একটি গোপন কথা নিজের মধ্যে আটকে রাখতে পারেন? নীরা যেন সেই প্রশ্নেরই এক নির্মম উত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল নেতাজিকে নিয়ে গোপন তথ্য।


চলেছিল প্রবল, অকথ্য, অসহনীয় নির্যাতন। তবুও তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি—এমনটাই তাঁর নিজের বক্তব্যে উঠে আসে। তাঁর উপর যা নির্যাতন করা হয়েছিল, তা সহ্য করার শক্তি ঈশ্বরই হয়তো তাঁকে দিয়েছিলেন। পরে উর্দু লেখক ফারহান তাজকে তিনি সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। স্বাধীনতার এত বছর পরেও সেই বক্তব্য শুনলে গলা শুকিয়ে আসে। মনে হয়—একজন মানুষকে কতটা ভাঙলে সে ভাঙে? আর একজন মানুষ কতটা অটুট থাকলে—সবকিছুর পরেও ভাঙে না? কী বলেছিলেন নীরা আর্য?

ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বিসর্জন দিয়ে নীরা আজাদ হিন্দ বাহিনীকে বাঁচিয়েছিলেন

নীরা আর্যের বিবৃতি

ট্রায়ালের পর ওরা আমাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজা দিয়ে আন্দামানের সেলুলার জেলে পাঠিয়ে দেয়। কালাপানি। এক একজন কয়েদীর জন্য একটি চোরা কুঠুরি ছিল সেখানে। ওখানে আরও অনেক রাজনৈতিক মহিলা বন্দীও ছিল। আমি সব সময়ই ভাবতাম, এই দ্বীপের মধ্যে থেকে কী করে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেব। শীতকালে ওই জেলে আমি একবারও কারও কাছে একটা কম্বলও চাইনি। শীতে দাঁত কামড়ে কষ্ট করে পড়েছিলাম। একদিন রাতে দুজন গার্ড এসে আমাকে দুটো কম্বল ছুঁড়ে দিল। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। তারপর ভাবলাম যাই হোক, শীতে কম্বল থাকলে কষ্টটা তো কমবে। কিন্তু এদিকে আমার তো হাত-পা দুটোই বাধা। লোহার শিকলে ঘাড়ও বেঁধে রেখেছিল ওরা। পরের দিন ঈশ্বর বোধ হয় আমার প্রার্থনা শুনল। ব্ল্যাকস্মিথ এল, আমার হাতের শিকল কাটতে লাগল। শিকল কাটার সময় হাতের কিছু মাংসও কেটে গেল। আমি সহ্য করেছিলাম। এরপর পায়ের বেড়ি খোলার সময় হাড়ে তিন-চারবার হাতুড়ি দিয়ে মারল। খুব যন্ত্রণা হল, আর পারলাম না। চিতকার করে উঠলাম। ওকে বললাম, তুমি কি অন্ধ? দেখতে পাচ্ছে না? এটা আমার পা, তুমি দু-তিনবার মেরে দিয়েছ। ও বলল, আমি তোমার বুকেও মারতে পারি। আর তুমি কিচ্ছু করতে পারবে না। আমি জানতাম, আমি ওখানে ক্রীতদাস। ওরা যা চাইবে, তাই করতে পারে। তাও আমি দমিনি। আমি ওর মুখের উপর বলি, মেয়েদের ইজ্জত করতে শেখো।

জেলার ঘটনাটি দূর থেকে দেখছিল। এবার সে সামনে এল। আমাকে বলল, যদি তুমি বলো, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস কোথায় আছে, তা হলে আমরা তোমাকে ছেড়ে দেব। আমি পাল্টা গর্জে উঠি, সবাই জানে নেতাজি প্লেন দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তুমি মিথ্যা বলছ, কারণ তুমি জানো নেতাজী এখনও বেঁচে আছে। জেলার বলল, এটাই শেষবার বলছি, বলে দাও। নেতাজি কোথায়? আমি তখন বলি, নেতাজি আমার মনে আছে, আমার হৃদয়ে আছে।

জেলার তখন প্রচন্ড রেগে গিয়ে বলে, নেতাজি যদি ওর হৃদয়ে থাকে, তা হলে সেখান থেকে নেতাজীকে বের করো। ব্ল্যাকস্মিথ সঙ্গে সঙ্গে ব্রেস্টরিপার নিয়ে নেয় হাতে। আমার ডান দিকের স্তন কাটতে শুরু করে। সেই যন্ত্রণা সহ্যের সীমার বাইরে। জেলার আমার সামনে এসে ঘাড় ধরে বলে, যদি আমি আর এখানে কারও সঙ্গে তর্ক করি, তাহলে আরেকটি স্তনের বেলুনও কেটে নেওয়া হবে। ওই ক্ষতস্থানে সাঁড়াশি দিয়ে আরও আঘাত করে জেলার। আর তারপর বলে, কুইন ভিক্টোরিয়াকে ধন্যবাদ জানাও, যে ব্রেস্টরিপার আজ গরম ছিল না।

সেই স্বাধীনতার দেশে আমার জন্য তুমি কী রেখে গেলে?

স্বাধীনতার পরে নীরা কী পেলেন?

এত কিছুর পর নীরার ভাগ্যে কী জুটেছিল জানেন? দেশ স্বাধীন হল। আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে মুক্তি পেলেন নীরা। কিন্তু এই স্বাধীন দেশে তাঁর জীবনে কি স্বাধীনতার সেই আলো পৌঁছেছিল? বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হায়দরাবাদের রাস্তায় ফুল বিক্রি করে জীবনের শেষ পর্ব কাটিয়েছিলেন নীরা। চাকরি জোটেনি। অর্থসাহায্য জোটেনি। রাষ্ট্রের কাছ থেকে সেই মর্যাদাটুকুও জোটেনি, যার হয়তো তিনি প্রাপ্য ছিলেন। এমনকি ভারত সরকার তাঁর ঘরটিও ভেঙে দিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য ছিল—ঘরটি সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত। ভাবুন একবার। যে নারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, স্বাধীনতার দেশে তাঁর মাথার উপরকার ছাদও একদিন রাষ্ট্রের আইনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল।


১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই মৃত্যু হয় নীরা আর্যের। একটি জীবন শেষ হল। কিন্তু রেখে গেল একরাশ প্রশ্ন। আর এই স্বাধীন ভারতের ডিএনএ-তে অজান্তেই ধরা পড়ে গেল যেন কিছু পুরনো রোগ। এই স্বাধীনতাই কি আমরা চেয়েছিলাম? কাদের জন্য নিজেদের জীবন বলিদান করেছিলেন বিপ্লবীরা?


ব্রিটিশ প্রশাসন চলে গেছে। কিন্তু— ইংরেজদের ভাবনা কি তাহলে আমাদের জিনেই থেকে গেছে? স্বাধীনতার সময় নেতাজি থাকলে কি এমনটা হত? নাকি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে? আশি বছর পেরিয়ে গেল। তবু হয়তো আমাদের জন্মভূমি এখনও সেই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর খুঁজে উঠতে পারেনি। কারণ স্বাধীনতা শুধু শাসকের হাত থেকে মুক্তি নয়। স্বাধীনতা মানে নিজের বিবেককেও মুক্ত করা। আর নীরা আর্যের জীবন আজও আমাদের সেই প্রশ্নটাই করে—যে স্বাধীনতার জন্য তুমি আমার শরীর নিলে, আমার যৌবন নিলে, আমার জীবন নিলে—সেই স্বাধীনতার দেশে আমার জন্য তুমি কী রেখে গেলে? জয় হিন্দ।

অন্যান্য প্রতিবেদন.