“আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো—প্রকৃত অন্ধ কে? চোখ বন্ধ করে যে হাঁটছে, নাকি সে, যে চোখ খোলা রেখেও আসল সত্যটা দেখতে পায় না? অথবা এই প্রশ্নটাও জরুরি—আমরা কি সত্যিই তাকে দেখতে বা জানতে চাই?”
তাই আমার মনে হয়, আজকের দিনে মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় অন্ধত্ব চোখের নয়, বরং চেতনার। যার চেতনায় ছানি পড়েছে, সে সত্যকে চিনবে কী করে? সে কেবল সেটুকুই দেখে, যেটুকু দেখলে সে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে। কোনো বিতর্কের মধ্যে সে যেতে চায় না; বরং প্রশ্নহীন আনুগত্যই সেখানে ভালো। সুতরাং তার কাছে রাষ্ট্র যা দেখায় আর ক্ষমতা যেটুকু মনে রাখতে বলে, তার মধ্যেই সে থাকতে ভালোবাসে। ফলে আমরা দেখি, সত্য চিরকাল আটকা পড়ে থাকে সেই মিথ্যের চশমাতেই। অনেকে হয়তো যে-কোনো বিষয়কেই ‘আপেক্ষিক সত্য’ বলে আড়াল করতে চাইবেন, কিন্তু ক্ষমতার শেখানো সাজানো বয়ানকে সত্য বলে মেনে নেওয়া আর সত্যকে অস্বীকার করা একই কথা। মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় একেই বলে Confirmation Bias—‘যেটা আমি বিশ্বাস করতে চাই, কেবল সেটুকুই দেখব; আর যা আমার বিশ্বাসের উল্টো, তা যত বড় সত্যিই হোক না কেন, স্রেফ মুখ ঘুরিয়ে নেব!’ আসল সংকট তথ্যের ঘাটতিতে নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
এই অসুখ কিন্তু বহু পুরোনো। প্লেটো তাঁর Allegory of the Cave-এ দেখিয়েছিলেন, গুহায় আটকে থাকা মানুষ কীভাবে দেয়ালের কয়েকটি ছায়াকেই একমাত্র বাস্তব বলে বিশ্বাস করেছিল। আজকের যুগেও স্ক্রিনে বা সিলেবাসে আমরা যা দেখি, সেটাই একমাত্র সত্য হয়ে উঠছে। এই কারণেই দার্শনিক হানা আরেন্ট আমাদের সতর্ক করে গেছেন—প্রশ্ন না করে অন্ধের মতো মেনে নেওয়ার অভ্যাস থেকেই সব অশুভ শক্তির জন্ম হয়। ক্ষমতা শুধু মানুষের হাত-পা বেঁধে রাখে না, বরং তার স্মৃতিশক্তিও চুরি করে নেয়।
এবার নিশ্চয়ই ভাবছেন, হঠাৎ এসব তত্ত্বকথা কেন বলছি? কারণ, ইতিহাসকে কীভাবে চোখ বেঁধে মুছে ফেলা হয়, তার প্রামাণ্য দলিল আমাদের নাকের ডগাতেই রয়েছে। আজ যদি কাউকে প্রশ্ন করি—“ভারতের প্রথম নৌবিদ্রোহ কবে হয়েছিল?”—নব্বই শতাংশ মানুষ চোখ বুজে উত্তর দেবেন, ১৯৪৬ সালে; আর গল্পটা বলবেন বোম্বাইয়ের তলোয়ার জাহাজের কথা। কিন্তু এই উত্তর কি পুরোপুরি সত্যি? আমার মতে, একদমই না। কারণ এর তিন বছর আগে, ১৯৪৩ সালে, ভারতের প্রথম নৌবিদ্রোহ ঘটেছিল ভারতীয় উপকূল রক্ষা বাহিনীর চতুর্থ সৈন্যদলে।
এরপরও যদি আপনাকে পাল্টা একটা প্রশ্ন করি—বলুন তো, একই দিনে, একই ফাঁসির মঞ্চে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কোন নয়জন বাঙালি বীর সন্তানকে প্রাণ দিতে হয়েছিল? আর কবে ঘটেছিল এই রক্তঝরা ইতিহাস? অধিকাংশ বাঙালি আজ স্তম্ভিত হয়ে চুপ করে থাকবেন, পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করবেন। কারণ তাঁরা এই ইতিহাস জানেনই না। এমনকি এই ঘটনার সত্যতা নিয়েও অনেকে সন্দেহ করতে পারেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ১৯৪৬ সালেরও তিন বছর আগে, ১৯৪৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জ দুর্গেই ঘটেছিল এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ।
আর এই ঐতিহাসিক ঘটনা কীভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে গায়েব হয়ে গেল, অথবা প্রচলিত ইতিহাসের ধারায় যখন এই নয়জন বাঙালির আত্মত্যাগের কোনো প্রতিফলন দেখি না, তখন বিস্মিত হতে হয়। অথচ আমরা এখনও এই মেকি সত্যের খেলায় নিশ্চুপ। দেশের মানুষের এই বীরত্বগাথা ভুলিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই তীক্ষ্ণ আক্ষেপ—“সাহেবরা যদি পাখি মারতে যান, তারও ইতিহাস লেখা হয়; কিন্তু বাংলার কোনো ইতিহাস নাই।”

এবার মূল ঘটনায় আসি—১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে কোচিন ও মাদ্রাজ উপকূলে কর্মরত একদল ভারতীয় সৈনিক ও নৌসেনানি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার শপথ নিয়েছিলেন। আমরা এই ঘটনাকে বলতে পারি ‘মাদ্রাজ কোস্টাল ডিফেন্স’-এর বিদ্রোহ। এই বীরগাথার প্রামাণ্য দলিল আজও সংরক্ষিত আছে India Office Records এবং The National Archives-এর কোর্ট মার্শাল নথিতে। শৈলেশ দে-র সুভাষ ঘরে ফেরে নাই গ্রন্থেও এই বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সুগত বসুর আকর গ্রন্থ দেশনায়ক: সুভাষচন্দ্র বসু ও ভারতের মুক্তি সংগ্রাম-এ এই জাতীয় ঘটনার উল্লেখ আমরা পাই। আবার গবেষক সুধীর কুমার মিত্রের হুগলি জেলার ইতিহাস এবং নৃসিংহপ্রসাদ ভট্টাচার্যের বঙ্গ সংস্কৃতির এক পর্ব গ্রন্থেও এই ঘটনার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। তবু স্বাধীনতার পর সেন্সরশিপ ও আমাদের উদাসীনতায় এই ইতিহাস রহস্যজনকভাবে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। এর কারণ অন্য কোনো প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করা যাবে। কিন্তু এই অসমসাহসী যোদ্ধাদের আসল অবদান কী ছিল, সেটা আমাদের জানা দরকার।
১৯৪৩ সালে এই নৌসেনাদের মধ্যে বেতন ও খাদ্যের তীব্র বৈষম্য, জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা এবং ইংরেজ অফিসারদের বর্ণবিদ্বেষী আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছিল। এই সময় গোপন সূত্র ধরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে ভারতীয় নৌসেনাদের যোগাযোগ ঘটে। নেতাজি তখন দ্বিমুখী কৌশল নিতে চাইছিলেন—একদিকে সীমান্তে বাহ্যিক আঘাত, অন্যদিকে দেশের ভেতরে সেনাছাউনিগুলোতে বিদ্রোহ তৈরি করা। গোপন বার্তাবাহক ও আজাদ হিন্দ রেডিওর মাধ্যমে তিনি মানকুমার বসু ঠাকুরদের মতো বিপ্লবী সৈনিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
প্রসঙ্গত বলি, এই বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন জমাদার মানকুমার বসু ঠাকুর এবং হাবিলদার সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়—যিনি বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাগ্নে; জন্ম ১৯২০ সালে মানিকতলায় এবং পৈতৃক বাড়ি হুগলির বলাগড়ের খামারগাছি-কামালপুরে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অচল করা, অন্যান্য সেনাঘাঁটির ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে সুভাষ বসুর বার্তা পৌঁছে দেওয়া, স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য ভারতীয় সৈন্যদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং ইংরেজদের প্রয়োজনীয় তথ্য আজাদ হিন্দ ফৌজের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই পর্যায়ে ভারতীয় নৌ অফিসাররা পরিকল্পনামাফিক প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ সমুদ্রে ফেলে দিয়ে ব্রিটিশ সামরিক শক্তিকে বিপদে ফেলেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ১৯৪৩ সালের ১৮ এপ্রিল গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।
গ্রেপ্তার হন নয়জন বীর সৈনিক—মানকুমার বসু ঠাকুর, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, দুর্গাদাস রায়চৌধুরী, নন্দকুমার দে, চিত্তরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, ফণিভূষণ চক্রবর্তী, নিরঞ্জন বড়ুয়া, কালীপদ আইচ এবং দিনেশচন্দ্র চক্রবর্তী।
তাঁদের বিচার প্রকাশ্য আদালতে হয়নি। ৬ জুলাই ব্যাঙ্গালোরের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চে গোপন সামরিক আদালত বসে। ৫ আগস্ট মামলার রায় বেরোয়। তাতে নয়জনের ফাঁসির আদেশ হয়; আব্দুর রহমান ও আর. এন. ঘোষের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর এবং এ. কে. দে-র সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্ব—কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগ—কেউই এগিয়ে আসেনি। কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ অবস্থায় আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকায় ’৪৬ সালের মতো ’৪৩-এর এই বিদ্রোহের পাশে দাঁড়ানোর কোনো বাস্তব সুযোগ তাদের ছিল না। এমনকি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ফাঁসি রদের চেষ্টা করেছিলেন বলে যে অলীক গল্প প্রচলিত আছে, শহীদ সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

ফাঁসির অপেক্ষায় থেকেও দুর্গাদাস রায়চৌধুরী দেশবাসীর উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে জীবনের জন্য কোনো করুণা প্রার্থনা ছিল না, ছিল না মৃত্যুভয়। ছিল শুধু একটি আবেদন—রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্য যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কখনও বিস্মৃত না হয়। একইভাবে সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর পরিবারের উদ্দেশে লেখা শেষ চিঠিতে জানিয়েছিলেন, কী অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে, তা তিনি জানেন না; তবে দেশের জন্য প্রাণ দিতে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। এই দুটি চিঠি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির দলিল নয়; স্বাধীনতার ইতিহাসে আত্মত্যাগের এক অনন্য নৈতিক উচ্চতার সাক্ষ্য।
১৯৪৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জে এই নয়জন বাঙালি বীরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ঔপনিবেশিক শাসক ভেবেছিল, তারা বিদ্রোহ দমন করতে পেরেছে। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ১৯৪৬ সালে একই দাবি এবং সংকল্প নিয়ে ভারতীয় নৌসেনারা বোম্বাইতে নৌবিদ্রোহ শুরু করেন, যা ব্রিটিশ শাসনের পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল।
প্রশ্ন হলো, তবু এই ইতিহাস স্মৃতির অন্তরালে থেকে গেল কেন? কারণ ইতিহাস কেবল ঘটনাসমষ্টি নয়, ক্ষমতার রাজনীতিও বটে। আর সেই রাষ্ট্রীয় নীরবতার মুখেই প্রতিধ্বনিত হয় জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী পংক্তি—
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যাঁরা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই—প্রীতি নেই—করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাঁদের সুপরামর্শ ছাড়া।
কিন্তু আমাদের মতন অন্ধদের কাছ থেকে ‘সুপরামর্শ’ নেবে কোন সরকার? কোন প্রতিষ্ঠান? কিংবা কোন রাষ্ট্রব্যবস্থা? সেই উত্তর আমার জানা নেই। তবে এটুকু জানি, মিলান কুন্দেরা মিথ্যে বলেননি—“ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম মূলত স্মৃতিকে বিস্মৃতির হাত থেকে রক্ষা করার সংগ্রাম।”
আর সেই কথাই অন্যভাবে স্মরণ করিয়ে দেন সপ্তদশ শতকের রাজনৈতিক দার্শনিক থমাস হবস। The Elements of Law গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন, “As it is my part to show my reasons, so it is theirs to bring attention.” অর্থাৎ, যুক্তি ও সত্যকে সামনে তুলে ধরা লেখকের দায়িত্ব; আর সেই সত্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়া পাঠকের।
তাই বলা যায়, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপদ ভুলে যাওয়া নয়; বরং ভুলে যাওয়াকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া। ১৯৪৩ সালের এই বিস্মৃত নৌবিদ্রোহ তাই কেবল অতীতের একটি অধ্যায় নয়, আমাদের কাছে এটা বর্তমানেরও একটি প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত পাঠককেই দিতে হবে। তিনি কি প্রতিষ্ঠিত বয়ানকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেবেন, নাকি বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে থাকা ইতিহাসের দিকেও একবার চোখ ফিরে তাকাবেন?

