ইস্কুল বাড়ির গায়ে ঝুলছে একটা জীর্ণ মানচিত্র৷ বঙ্গোপসাগর থেকে তলার দিকের অংশটা ছিঁড়ে গেছে ৷ দেখলে মনে হয় যেন খাবলা মেরে টেনে নিয়ে গেছে কোনো ইঁদুর জাতীয় প্রাণী৷ এই ইস্কুলবাড়ির পাশ দিয়ে বইছে রুগ্ন নদী৷ দূরে ছড়ানো ছিটানো কিছু ঘর৷ লোনা দেওয়াল, টিনের চাল৷ দেওয়ালের কারুকার্যে প্রতি বর্ষায় ধ্বসে যাওয়ার নকশা৷ তার মধ্যে ছিটে ছিটে উন্নয়নের দাঁত-নখ-থাবার আঁচড়ের আঁকিবুঁকি৷ এ তল্লাট মূলত মৎসজীবিদের৷ বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায় নদীতে জাল ফেলার শব্দ৷ আঁশটে গন্ধ যেন সুগন্ধি ধূপের মতন ম ম করে ঘর-দোর আঙিনা জুড়ে৷ নদী পাড়ে সার বাঁধা ডিঙিনৌকার মহড়া৷ কেউ তাতে এঁকে গেছে সওদাগরের সপ্তডিঙার ছবি৷ কোনোটার গায়ে আঁকা কচ্ছপ । ক্রমে অন্ধকার নেমে আসছে অঞ্চল জুড়ে৷ ম্যানগ্রোভের ছায়ায় ছায়ায় আঁধার যেন খানিক দীর্ঘতর করে তোলে নিজের কালো রহস্যময়তাকে এখানে৷ নদীপাড়ের গা ঘেঁষে যে খুপরি ঘর ,দূর থেকে দেখা যাচ্ছে হলুদ আলোর স্তিমিত ছটা তার ভিতর ঘর থেকে৷ কখনো কখনো চিরচির করে উঠছে সেই বাল্বের আলো৷
“আমার পিঠের দাগটাই একমাত্তর আমার নিজের দ্যাশের রে ভবা! কাঁটাতার ডিঙ্গানোর কালে আঁঞ্চলে টান পইর্যা মুখ থুবড়াইয়া পড়ি৷ জানিনাই সেই কাঁটাতার ইন্ডিয়ার না পাকিস্তানের! ওপার থিক্কা মা চেঁচায়ে কইসিলো ‘ সামলাইয়া যাও বেণি! বাবারে বোনটারে দেইখ্যো।’ – টিমটিমে বাল্বের আলোয় বুড়িদাইয়ের কাছে বসে এসব গল্প শোনে শরমা আর ভবা।” মা আমার মোছলমানের বেটি আসিল৷ সেই শ্যাষ আম্মুর গলা শুনা৷ সেই শ্যাষবার আমার দ্যাশের ধূলা শরীরে লেপ্টে যাওয়া৷ বেড়া টপকাইল বাপ৷ বেড়া টপকাইল বোন৷ বেড়া টপকাইলাম আমি৷ ওই দূরে দাঁইর্যা হাত নাড়লো আম্মু৷ আমার মোছলমান আম্মু৷

শরমাদের ইস্কুলে শহর থেকে এক নতুন মাস্টারমশাই এসেছে পড়াতে কদিন হলো৷ সেই মাস্টারমশাই সেদিন সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কথা বললে শরমা চেঁচিয়ে ওঠে – “ কীসের সমন্বয় রে বাবু! মুরা মুন্ডা৷ মুদের ইতে কুনো লজ্জা ট নাই৷ মুদের যদি তুর পড়াইনতে হয় তো মুন্ডা ভেবেই পড়াইনতে হবেক৷ সাধারণ মানুষ ট ভেবে নয়৷ মুরা মুন্ডা। ইটই মুদের পরিচয়৷ ” সারা ক্লাস হাঁ করে তাকিয়ে ছিলো ওর দিকে৷ কী জানি মাঝে মাঝে কী হয় ওর৷ বুড়িদাইয়ের গল্প শুনতে শুনতে আনমনে ফের এসব কথা মনে পড়ে যায় ওর৷
ভবা বলে উঠলো, “তারপর? “
-“তারপর? আমিও খাড়ায় থাকলাম। আম্মু তহন তুলসি তলায় আজান দিয়া কপালে সিঁন্দুর ঠেকায় হয়তো৷ হয়তো বা তার হাত থিক্কা কাঁচের কাকন ভাইঙ্গা হাতে উঠসে বন্দুক! এপারে তহন বড় বড় চোঙে জোরে জোরে শব্দ হয় – ” জয়জয়জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা”… আমার বিধাতা তহনও জানেনা আইজ হতে সে আর ভারতের বিধাতা নাই৷ আইজ হতে সে ইন্ডিয়ার ঠাউর৷ যার পদ্মা থিক্কা ছিঁড়ে নেওয়া হইসে নাড়ি৷ বুক চিইর্যা বানায়ছে স্বাধীনভারত৷ বেড়া টপকাইবার কালে আম্মু হেঁসেল ঘরের কালি লেপে দিয়াসিল সারা গায়ে মুখে৷ আমার দ্যাশের কালি…”
আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের কোন মুছতে মুছতে দাওয়া ছেড়ে ঘরে যায় বুড়ি৷ ভবা চেয়ে থাকে আকাশের দিকে…
এলাকার বড়রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে রোজ সকালে দু লিটার দুধে এক লিটার জল মিশিয়ে তিন লিটারেে বিক্রি করে শরমার বাবা । বাপের এই কাজ অন্ন জোগায় সাতজনের জটলাপাকানো পরিবারের মুখে৷ যদিও শরমা জানে একদিন বাপের এ কাজ তাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠবে৷ তখন আর কেউ জাতে আর ভাতে দলা পাকিয়ে পাকিয়ে খাইয়ে দেবেনা ওদের। সে চায়ও না তা৷ জাত আর ভাতকে এবার থেকে সে আলাদা করেই দেখতে চায়। বাপ বলে – “উ গাই ট মুদের মা আছেক রে বিটি”৷ শরমা জিজ্ঞেস করেছিলো – উ ইস্কুল ট তে যে বলে ই দ্যাশ ট মুদের মা আছেক! দ্যাশ কি তাইলে গাই রে বাপ! বাপ কইছিলো – “ উ গাই ট মুদের দ্যাশ রে বিটি “৷ মা৷ দ্যাশ মানে মা৷ গাই ট মুদের দ্যাশ৷ গাই ট মুদের মা৷ বাপ মুদের মা ট তাইলে কে? দ্যাশ না গাই! জাতের সাথে ভাত মিশিয়ে ভাতের ফ্যানায় ভারতবর্ষের সাথে মাটি কাটা নালা দিয়ে গড়িয়ে গেছে শরমার মা৷ তাকে কেউ দেশ অথবা গাই কোনোটাতেই স্থান দেয়নি কখনো৷ শরমার মায়া জাগে৷ মা টার জন্য কেমন বুকটা চিনচিন করে ওঠে৷
ইস্কুলের সেই মাস্টারমশাই একদিন শরমা কে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী পড়তে দিয়েছিল৷ শরমা পড়েও ছিলো৷ ভাঙা ভাঙা গলায়৷ রাতে বেতের মাদুরে শুয়ে মা কে শুধিয়েছিলো – “ তু মুর নাম নন্দিনী রাখিসলাই ক্যান রে! “….
শরমার রোজ ভাবে বাপ মরলে ওই গাই টা হাটে বিক্রি করে দিয়ে গাইয়ের জায়গায় তার মা কে বসাবে সে৷ বাপে কইসে “ উ গাই ট মুদের দ্যাশ “৷

শরমাদের ভিটে ছিল মাটি ছিল জাত ধর্ম ঠাকুর দেবতা মন্তর তন্তর সব ছিল৷ কারা যেনো একদিন এসে বলে গেলো এ দেশ ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক দেশ৷ ওই নিরপেক্ষতার ধামার নীচে চাপা পড়ে গেলো শরমাদের ভিটে মাটি জাত ধর্ম ঠাকুর দেবতা মন্তর তন্তর৷ শরমার বাপের বাপ লড়েছিল বটে এ দেশের হয়ে৷ ইংরেজ ব্যাটেলের সামনে৷ শরমার বাপ কখনো এ দেশের জন্য লড়তে পারেনি কংগ্রেসের সামনে৷ শরমার বাপও ময়না পাখির মতো মুখস্ত করে নিয়েছে “ মোদের কোনো দ্যাশ নাই মোদের কোনো ভাষা নাই মোদের কোনো জাতি নেই “….
শরমা জাতের থেকে ভাত কে একটু একটু করে আলাদা করে রোজ। ভারতবর্ষ জানে সে শরমার মা নাহ্৷ শরমার পরিচয় তাই , শরমা সোরেন। বাসা – তুলাপট্টি গ্রাম৷ জিলা-পুরুলিয়া। জাত – মুন্ডা। ভাত- দেশ। কাঁটাতার- মনুষ্যত্ব।

