বুড়িগঙ্গার স্মৃতি তখন ঝাপসা হচ্ছে আমাদের ‘মহব্বতের মফস্বলে’। চন্দ্রবিন্দু নামে কোনো বাংলা ব্যান্ড নেই তখনও এই কলকাতা শহরে। তাই আদরের নৌকো শব্দটাই শোনা হয়নি। তবে দিস্তা খাতার শেষভাগ থেকে ছিঁড়ে কাগজে মোড়া যে নৌকোগুলো আমরা আষাঢ়-শ্রাবণে জমা উঠোনের জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম তাতে আদর কম ছিল না! অঙ্ক খাতার শূন্য পাওয়া হিসেব তাতে ধুয়ে যেত নিমেষে। ওই আমাদের বুড়িগঙ্গা, ওই আমাদের সন্ধ্যা নদী। রেশনের মোটা চালের খিচুড়ি, পাপড় ভাজা, মায়ের উনুনের আঁচে যখন হলদে খিচুড়িতে ফুট আসত, তখন উঠোনের জলে সুপুরি গাছের পাতা নুইয়ে পড়া জলের টপ টপ করে বয়ে চলা আমাদের পৌঁছে দিত বরিশাল, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ। মায়ের মনে পড়তো তার বুড়িগঙ্গার কথা, বড়মা বলতো তার ফরিদপুরের ছোট পিসির বাড়ির পেছনে নাকি বিরাট এক দিঘি ছিল। সে দিঘির ধারে হেলে পড়া তাল গাছে বসে পিসেমশাই খ্যাপলা জাল ফেলত। তাতে উঠে আসতো রুপোর মত চিকচিকে ফলুই মাছ। সেই মাছভাজা, গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি তারপর আর কোনোদিন খায়নি বড়মা। মা এ দেশে এসে আর কোনোদিন পায়নি টাটকেনি নামের একটা মাছ। সেই বুড়িগঙ্গার মাছ, মেহফিল নামের একটা মেয়ে, তেঁতুল গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া দিলীপ মাইতির বাড়ি, আরো কত কিছু নিয়ে ওদের বর্ষামঙ্গল ছিল। আর আমাদের?

আমাদের কাদা পায়ে ফুটবল, স্কুলফিরতি পথে মাছ, টালির চালের নিচে বালতি পেতে বৃষ্টির জল গায়ে মাখা, হঠাৎ ছুটির আড্ডা, একটা গোটা বাংলাদেশ তো আমাদের বুকে ছিল, কাদামাখা কীর্তনখোলা ছিল। যাঁরা এই ভেঙে যাওয়া মানচিত্রে তিরিশের বেশি বর্ষা পেলাম, মাধবীলতা তুলে প্রেমিকার জানলায় দিয়ে বললাম, মফস্বলের মহব্বত!
আসলে ক্যালেন্ডার যাই বলুক না কেন আমাদের কাছে আকাশ বেয়ে বৃষ্টি নামা মানেই ছিল মাছ ধরার মরশুম। সেটা যদি আষাঢ়ের বদলে চৈত্রের শেষ কিংবা বৈশাখ হয়, তবুও বছরের প্রথম বর্ষায় সোঁদা মাটির গন্ধ মেখে দাসবুড়ির পুকুরে কিংবা খেপলীর বিলে ওই দুটো কই মাছ উঠে আসা মানেই সেটা বর্ষার শুরু। লতিফ দাদা, জমির চাচা খ্যাপলা জাল নিয়ে ঘুরবে, হেলমেট বাবাই কোঁচ নিয়ে বসে থাকবে ইটখোলার পুকুরে, কার্তিক কুন্ডু ঘামাচি মারতে ছাদে একটু ভিজে নেবে, ফারুক আলী তার শতছিদ্র ঝাঁকি জাল নিয়ে মাত্র কয়েকটা লালমুখো পুঁটি পাবে এই তো বর্ষা! এভাবেই তো কাকভেজা হতো বুড়ো জামরুল গাছ। এভাবেই তো বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আষাঢ় আসত রিফিউজি কলোনিতে। তলনবমীতে পলুয়া হতো, বিভূতিবাবুর মেঘমল্লার পড়ে চমকে উঠত স্কুলে বাংলায় নিরানব্বই পাওয়া নীলাঞ্জন হালদার। আর লাল-হলুদ পতাকা বুকে জড়িয়ে নগেন কাকা দলবল নিয়ে দুশো সাঁইত্রিশ নম্বর বাসে উঠে বলত, জয় মা ইস্টবেঙ্গল। আর আজ এতগুলো বছর পেরিয়ে মনে হয় এই যে বৃষ্টিমাসগুলোতে জমে থাকা জলের কারণে ইটখোলার মাঠে যে খেলা বন্ধ হয়ে যেত, তাতে কি আমাদের আসলে দুঃখ হতো? নাকি এই বৃষ্টিদিনের মিষ্টি দুঃখ নিয়েও আমরা বেশ ভালই ছিলাম!

আমার সেজমাসি, মানে জোছনা হালদারের বাড়ি ছিল (এখনো আছে) গাঁড়াপোতা নামের একটা গ্রামে। বাঁওরের ধারে। সেখানে মাকাল গাছের পুজো হতো। গাব গাছের নিচে যেত না কেউ সন্ধ্যা হলে। বাঁওর মানে হয়ত শহরের মানুষ বুঝবেন না, কারণ এই শব্দের সাথে মেলামেশা বাংলার অল্প কিছু অঞ্চলের মধ্যেই। দেশভাগ পরবর্তী বনগাঁ, গোবরডাঙ্গা, বাগদা এবং পূর্ববঙ্গের খুলনা, যশোরের কিছু অঞ্চলে দেখা মেলে বাঁওরের, অনেকটা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মত দেখতে এই জলাশয়ের কথা বিভিন্ন লেখায় লিখেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আজও বনগাঁর মজে যাওয়া ইছামতির মানচিত্রের শিরায় শিরায় অনেক বাঁওর আছে। হয়ত নেই টাটকেনি নামের একটা অদ্ভুত মাছ। নেই শিবজটা ধানের গাছ। নেই মরিঘাটার মেলায় খুলনার ইন্দ্রমোহনের রসগোল্লা। তবু বর্ষা এলে রথের মেলায় ওই ইছামতির মানচিত্রটা আমাদের ফিরিয়ে দিয়ে যেত গাঁ-গঞ্জের মহব্বত। শান্তিশ্রী নামের একটা সিনেমা হলে চলত তরুণ মজুমদারের ফুলেশ্বরী।
সেটা ২০০০ সালের কথা। বর্ষায় বেড়াতে গিয়েছি গাঁড়াপোতা। হঠাৎই ইছামতীর জলস্তর বাড়তে শুরু করে। বাঁওরের জল বেড়ে উঠে আসে মাসির শিরীষ গাছ পর্যন্ত। সেই গোবর দিয়ে নিকোনো রান্নাঘর, কাঠের জালে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, ঝলসে যাওয়া চোখে আমি জীবনে প্রথমবারের জন্য বন্যা দেখেছিলাম। দেখেছিলাম বেচারাম মন্ডল, অনিল মাইতি, শম্ভুনাথ হালদার, মিনতি বক্সীর মাটির ঘর-দুয়ার নিমেষে জলের সঙ্গে ভেসে যেতে। হাজার হাজার গরু, বাছুর, ছাগল সেদিন বয়ে গেছিল ইছামতীর জলে। বুভুক্ষু মানুষের কান্নার সঙ্গেই বয়ে গেছিল হাজারও স্বপ্ন। কারও বইয়ের মলাটে সৌরভ গাঙ্গুলির ছবি ছিল, কারও ক্যালেন্ডারে বিয়ের তারিখ ছিল, কেউ লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে জমিয়েছিল পুজোর মেলা দেখতে যাওয়ার টাকা, আরও কত কি। একটু চাল, একটা ত্রিপল, একটু পানীয় জলের জন্য সেই আর্তনাদ দেখে বুঝতে শিখেছিলাম বর্ষা মানে শুধুমাত্র দাসবুড়ির পুকুর থেকে লাফিয়ে ওঠা দুটো কই মাছ নয়। ওই আকাশ থেকে নেমে আসা জলরাশি আদতে সুখ-দুঃখের ঝুলবারান্দা। ওই যে বলে না, ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ।’সেই বন্যার জল নামতে পেরিয়েছিল প্রায় নভেম্বর মাস। বনগাঁ, গাইঘাটা, বাগদা, হেলেঞ্চা, হাঁসখালি, কৃষ্ণনগর, রানাঘাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ বহুকাল তাঁবু টাঙিয়েই থেকেছেন। দুগ্গা পুজো দেখা হয়নি জলঙ্গি, ইছামতী, চূর্ণীর ধারে। নতুন জামা হয়নি ঘোতোন, নিঙা, রানা, উজ্জ্বলদের। জমিতে যত পাট, ধান ছিল সব ধুয়ে গেছিল বন্যায়। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ফ্যান কবিতার মত কিছু বন্যা বিধ্বস্ত মানুষ নিয়ম করে আমাদের মফস্বলে তখন আসত পুরোনো জামা, কিছু চাল-ডাল চাইতে। সাঁইত্রিশ শতাংশ কমিউনিস্ট ভোটারদের মধ্যে অনেকেই সেসব মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। আর গুজরাটি বাসনওয়ালির থেকে থালা, বালতি, গ্লাস নিয়েছেন পুরোনো জামা, শাড়ির বদলে।

তারপর বহুকাল পেরিয়েছে। সাঁইত্রিশ কমে হয়েছে ‘চার’ শতাংশ। সেই কমিউনিস্ট ভোটাররা ইদানীং মসজিদ থেকে মাইক নামানোর খুশিতে চেঁচিয়ে বলেন জ্যায় শ্রী রাম! ইছামতী শুকিয়েছে, চূর্ণীর জলে কারখানা থেকে নির্গত বিষ মিশেছে। জলঙ্গীর ধার থেকে মাটি কেটে ইট তৈরি হয়েছে। আমাদের মফস্বলে আর কেউ বর্ষার ধার ধারে না। কেউ নেই নৌকো ভাসানোর। আর কোনো ক্লাস থ্রীর পঞ্চানন পোদ্দার অঙ্কে শূন্য পায় না। ফারুক আলী, লতিফ মন্ডলদের ছিঁড়ে গিয়েছে সেসব খ্যাপলা জাল। খলসে মাছ আমি দেখিনি বহুকাল। লালমুখো পুঁটির কেজি চারশ টাকা শহরের বাজারে। ইটখোলা মাঠে প্রথম বর্ষায় আজ আর উঠে আসে না কোনো হলদেমুখো কই মাছ। ক্ষেপলীর বিলের দখল নিয়েছেন এক মস্ত তৃণমূল নেতা। মাছ ধরা তো দূরঅস্ত, সাঁতার কাটাও মানা সে বিলে। বন্যা কোথায়? ইছামতীতে তো সারাবছর জলই থাকে না ইদানীং। কেউ তালডিঙি বানায় আজ জমা জলে ভাসবে বলে। আমাদের বড় হয়ে যাওয়ার মানচিত্রে সেসব বৃষ্টি-কাদারা হারিয়ে গিয়েছে কালের নিয়মে। বড়মা নেই। মায়ের আজকাল ক্ষীণ মনে পড়ে বুড়িগঙ্গার কথা। গাঁড়াপোতাও যাওয়া হয়নি বহুকাল। দেখা হয়নি জোছনা হালদারের মলিন মুখ। কীভাবে ঝমঝমিয়ে পড়া বৃষ্টির জল ইছামতীর গায়ে পড়লে ধোঁয়াটে মাঠের মত মনে হয় তাও আজ শুধুই স্মৃতি। নগেন কাকা চলে গিয়েছে আজ সাড়ে তিন বছর। রিফিউজি কলোনিতে আজ আর কেউ বরিশালের গল্প বলে না। হাঁটু জল ভেঙে সোজনেডোবা গাঁয়ে পৌঁছনোর কথা বলে না। কীভাবে আপ বনগাঁ লোকালের জানলা থেকে বৃষ্টিভেজা মছলন্দপুর স্টেশনটা দেখতে লাগে, তাও ভুলে গিয়েছি মনে হয় ইদানীং।

তবু আজও বৃষ্টি এলে আমাদের মফস্বলের মহব্বতে আতর আলীর বাগানটার দিকে তাকালে ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়া যায়। নগেন কাকা না থাকলেও, তাঁর নেতা চারু মজুমদার আজও শোভা পান প্যালেস্টাইনের সমর্থনে মিছিলে হাঁটা এক আইরিশ যুবকের চেতনায়। মা ফোন করে জানতে চান, ‘খিচুড়ি খাবি?’ লতিফ মন্ডল একবার হলেও ঢুঁ মারে দাসবুড়ির পুকুরে। মায়ের কলমি বাগানের গাছগুলো আরও একটু সবুজ হয়। তবু আজও জলঙ্গীর পারে আজীবর মন্ডল নামের এক চাষা ধান বুনতে বুনতেই আওড়ান, “গ্রাম নগর, মাঠ পাথার, বন্দরে তৈরি হও / কার ঘরে জ্বলেনি দীপ, চির আঁধার তৈরি হও / কার বাছার জোটেনি দুধ, শুকনো মুখ তৈরি হও… ” ক্ষেপলীর বিলে জারুল গাছের দল আজও আষাঢ় এলে যেন আজও চেঁচিয়ে বলে, আহ্! বেঁচে থাকা কী সুন্দর।

