ভিক্ষা সেরে ঘরে ফিরে শিবপোশাক খুলে রাখে জগা। তার জটার নীচ থেকে বেরিয়ে পড়ে রুক্ষ আধপাকা চুলের চ্যাপটা মাথা। কপালে আঁকা ত্রিনয়নের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে ওঠে মহাজাগতিক বলিরেখা। হাতের ডমরু নামিয়ে রাখতেই মুঠো থেকে ঝরে পড়ে কাদামাটির মতো ঘাম। কলতলায় গিয়ে গা রগড়াতেই মহাদেবের গায়ের নীলরঙ গলে গলে ধুয়ে মিশে যায় নর্দমার জলে, গিয়ে মেশে গঙ্গায়। চকচক করে ওঠে জগার কালসিটে পড়া, সিঁটকে শীর্ণকায় চেহারা।

এ তল্লাটে যারা আসে যায় বা কোন্ কালে এসেছিল, তারা জানে—এখানে শিবের জটায় গঙ্গা নয়, ধারণ করা আছে হাইড্রেনের দূষিত জল। গলায় দোলে শুকনো ডুমুর ফলের মালা, কণ্ঠে রুদ্রাক্ষের বদলে করবী বীজ। শহরের একপাশে যেখানে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় আধুনিক মহাজাগতিক নভশ্চর, ঠিক তার নিচেই শ্রাবণ মাসের সোমবারে গাজনের বাজনা নিয়ে ঘোরে বহুরূপীর দল। রাতে বাজে লরে-লাপ্পা বাপ্পি লাহিড়ী, আর সকালে লতা-সন্ধ্যা-কিশোর। তারপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে, ত্রিশূল উঁচিয়ে আশীর্বাদ দিয়ে চাল-ডাল-টাকাপয়সা জোগাড় করে মহেশ্বর—জগা ভিখিরির বেশে।
ভাঙাচোরা ঘরে চন্দ্রমার আলোয় চুলো জ্বলে। মাটির হাঁড়িতে ফোটে আধসেদ্ধ ভাত। ছটফটানি খিদের শরীরে হাতের সামনে যা পাওয়া যায়, তা-ই তখন নৈবেদ্যসম। পোড়া ভাত, জলকাদা ডাল, দগদগে ফলকুচি, বাসি মেয়েমানুষ- খিদের পেটে অখাদ্য বলে কিছু নেই। রাত গভীর হলে, কল্কির ফুলকির তীব্র শিৎকারে আর গাঁজার ধোঁয়ায় নেশাগ্রস্ত হয়ে জেগে ওঠে শিবঠাকুরের জটার চাঁদ।
শ্রাবণ সংক্রান্তির এই ভাদ্রমুখী গুমোট রাতে, জগার মাটির উঠোনে নামে ‘ঝাঁপান’ পরব। গ্রামবাংলার আদিম লৌকিক উৎসব। গাঁয়ের ওঝা, বৈদ্য আর সাপুড়েরা ঝাঁপারি বা সর্পসুদ্ধ বেতের ঝুড়ি নিয়ে হাজির হয় খড়ের চালের নিচে। উঠোনের একপাশে কাঁসার ঘটিতে গঙ্গার জল, সিঁদুর মাখানো ঘট আর মনসাসিজ গাছের ডাল পুঁতে শুরু হয় বিষহরির পুজো। দুধ আর কলা দিয়ে তুষ্ট করা হয় ঝুড়িবন্দী গোখরো-কেউটেদের। ধুনোর গন্ধ আর কাঁসরের শব্দে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ওঝার দল গাইতে শুরু করে মনসামঙ্গলের আদিম পয়ার।
বেহুলার ভাসান আর চাঁদ সওদাগরের নাভিশ্বাসের উপাখ্যান জুড়ে লোকায়ত কাহিনী জীবন্ত হয়ে ওঠে রাতের অন্ধকারে। মনে পড়ে যায় সেই লোহার বাসরঘরের কথা, যেখানে কালনাগিনীর দংশনে ঢলে পড়েছিল লখিন্দর। সতী বেহুলা কলার ভেলায় স্বামীর পচা-গলা মৃতদেহ নিয়ে ভেসেছিল গাঙুড়ের জলে। নেতাই ধোপানির ঘাটে গিয়ে দেবসভায় নেচে স্বামীকে ফিরিয়ে এনেছিল সেই নাঁচুনি মেয়ে । ‘চেঙমুড়ি কানী’র পায়ে অঞ্জলি দেওয়ার গানে মজে ওঠে আসর।
কোথা থেকে এসে জোটে এক ফ্যাকাশে জ্যোৎস্নার আধফালি চাঁদ৷ জগা ডুব দেয় বেলোয়ারি জলে—যেথা গতকাল ডুবে মরেছে এক পিশাচী মাগী। তার কোল-কাচানো ছেলে জলের পাশে বসে একটানে ঝিঁঝিপোকার সুরে সুর মিলিয়ে ডেকে চলেছে শিবনাম। ঝাঁপানের মাদল বেজে ওঠে প্রবল আক্রোশে। সাপের ফণার মতো দুলতে থাকে জগার শীর্ণ শরীর৷ নাগমহাশয়ের পুজোয় তখন মজেছে বালিয়াড়ির গাজন। জগা এসে হাত রাখে ছেলেটির মাথায়। তাকে সযত্নে উরুর ওপর বসিয়ে শিখিয়ে দেয় দ্রৌপদীর হরণমন্ত্র। সাথে মনসামঙ্গলের গোপন পয়ার। ভিক্ষার পাত্র এগিয়ে দেয় বেনোবুড়ি—তাতে প্রথম একমুঠো চাল দিয়ে যাবো জগা৷ নিজের পাত্র থেকে তুলে…
দূর উঠোন থেকে ভেসে আসে আপামর রমণীর সুর-
“শিবের মানস কন্যা তুমি দেবী পদ্মাবতী,
নাগরাজ বাসুকীর ভগিনী মহামতি।
পদ্মপাতায় জন্ম তব তাই নাম পদ্মাবতী,
বিষহরি নাম তোর ত্রিভুলে খ্যাতি…”
জগা তুলে নেয় শিবপোশাক৷ তার জটার নীচ ঢাকা পড়ে রুক্ষ আধপাকা চুলের চ্যাপটা মাথা। কপালে আঁকা ত্রিনয়নের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে ওঠে মহাজাগতিক বলিরেখা। ভেসে যায় মনসার ভেলা বিষহরণের নামে৷ সেই বিষ কন্ঠে নিয়ে পরের দিন সকালের জন্য নীলকন্ঠ সাজে জগা৷ ভিক্ষা মেলে ঢের৷ নদীখাত ঘুরে গঙ্গাস্তোত্রে লেখা থাকে সদাগরের নাম৷

