বাঙালির শ্বেতশুভ্র আভিজাত্যের নাম ‘গিলে করা পাঞ্জাবি’

২৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


উত্তমকুমার থেকে চিন্ময় রায়, বা  পাড়ার ব্রজভূষণবাবু থেকে ব্যারিস্টার অখিল ঘোষ- ​বাঙালির পোষাক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর বনেদিয়ানার  এক অনুপম  বাহক ছিলো সেকালীন ‘গিলে করা পাঞ্জাবি’। আধুনিক ডিজাইনার লেবেল, কৃত্রিম সিল্ক কিংবা ফাস্ট ফ্যাশনের এই যুগে হয়তো সেই দিনগুলো অতীত, কিন্তু একসময় বাঙালি ভদ্রলোকের আত্মমর্যাদা এবং স্ট্যাটাস সিম্বল ছিল এই বিশেষ কায়দায় মাড় দেওয়া ও ভাঁজ করা পোশাকটি।
​নদিয়া জেলার শান্তিপুর বা ফুলিয়া মানেই যেমন তাঁতের শাড়ির পসরা, তেমনই এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে পুরুষালি পোশাকের এক সূক্ষ্ম শিল্প—‘গিলে করা’ বা স্টার্কড (Starched) অর্জেন্ডি কিংবা মিহি সুতির পাঞ্জাবি। একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পরিবারে জামাইয়ের আগমন কিংবা বর্ষবরণ, পূজা-পার্বণ থেকে শুরু করে পহেলা বৈশাখ—বাঙালির জীবনের প্রতিটি আনন্দের ক্ষণে এই পাঞ্জাবি ছিল অপরিহার্য।

গিলে পাঞ্জাবিতে উত্তম কুমার


​
​‘গিলে করা’ শব্দবন্ধটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক নিখুঁত কায়িক শ্রম ও ধৈর্যের ইতিহাস। ‘গিলে’ কথাটি এসেছে মূলত মাড় দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে। অতীতে আধুনিক ইলেকট্রিক আয়রন বা কেমিক্যালের রমরমা ছিল না। মিহি সুতির কাপড়, বিশেষ করে ফাইন মলমল বা অর্জেন্ডি কাপড়ের পাঞ্জাবি ধোওয়ার পর সুতির কাপড়ের তৈরি ঘন মাড় (ভাত বা গমের মাদার দিয়ে তৈরি) অথবা অ্যারারুটের ঘন দ্রবণে চুবিয়ে রোদে শুকানো হতো।

​এরপর ঠিক শুকিয়ে যাওয়ার আগে, সামান্য ভেজা অবস্থায় সেই পাঞ্জাবিতে নিখুঁত ভাঁজ দিয়ে ভারী ইস্ত্রি বা কয়লা-চুল্লির ভারী আয়রন দিয়ে চাপ দিয়ে চেপে দেওয়া হতো। এর ফলে কাপড়ের প্রতিটি ভাঁজ বা কলার এমন এক শক্ত ও মচমচে ভাব পেত, যা দূর থেকেই চকচক করত। এই প্রক্রিয়ার পোশাকি নামই ছিল ‘গিলে করা’। এর মাধ্যমে কাপড়ের বুনটে তৈরি হতো এক রাজকীয় কাঠিন্য ও আভিজাত্য, যা পরলে পিঠ সোজা হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হতেন যে কেউ।


​
​নদিয়ার শান্তিপুরের তাঁতি ও কারিগরদের হাতের জাদুতে তৈরি হতো এই বিশেষ কাপড়। পরবর্তীকালে তা চলে আসত কলকাতার পুরোনো বনেদি বাড়িগুলোতে—উত্তর কলকাতার সোনাগাছি, জোড়াসাঁকো, হাতিবাগান কিংবা ভবানীপুরের কিছু ঐতিহ্যবাহী ধোলাই বা লন্ড্রি এবং পুরোনো ইস্ত্রির দোকানে।
​কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কিছু পরিবার আজও দুর্গাপূজা বা বিশেষ পারিবারিক অনুষ্ঠানে এই ঐতিহ্যের ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। উত্তর কলকাতার অলিগলিতে এখনও এমন কিছু প্রবীণ ধোপা বা কারিগর আছেন, যারা বংশপরম্পরায় এই গিলে করার কাজ বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদের কাঠের পাটাতন এবং ভারী লোহার ইস্ত্রির ছাঁচে তৈরি হয় সেই চিরচেনা সুবাস ও পরিপাটি ভাব।

​আজকের দিনে লাইফস্টাইলের দ্রুত পরিবর্তনে ইজি-কেয়ার কটন বা পলিয়েস্টার মিশ্রিত কুঁচকানো যায় না এমন (Wrinkle-free) কাপড়ের জয়জয়কার। ঘাম শুষে নেওয়া সেই মিহি সুতির কদর কমতে কমতে গিলে করা পাঞ্জাবির কদর আজ প্রায় বিলুপ্তির মুখে। তরুণ প্রজন্ম এই দীর্ঘমেহতি পরিচর্যার ঝামেলায় যেতে চায় না।


​তা সত্ত্বেও, শিকড়সন্ধানী বাঙালি যখনই কোনো সাংস্কৃতিক উৎসবে পা রাখে, তখন এই শ্বেতশুভ্র গিলে করা পাঞ্জাবির আবেদন নতুন করে অনুভব করে। এটি কেবল একটি পোশাক নয়; এটি বাঙালির আভিজাত্য, বনেদিয়ানা এবং রুচিবোধের এক জীবন্ত দলিল। ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগে এই বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা এবং এর কারিগরদের সম্মান জানানো আজকের প্রজন্মের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.