তিনি চাকরিতে ঢুকেছিলেন সরকারের নিয়ম মেনে। সরকার তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করেছে, তাঁকে নির্বাচন করেছে, নিয়োগপত্র দিয়েছে। তার পর পনেরো-কুড়ি বছর ধরে সেই সরকারই তাঁকে শিক্ষক হিসেবে কাজে লাগিয়েছে—ক্লাস করিয়েছে, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব দিয়েছে, নির্বাচনের কাজ করিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে, ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে। শিক্ষা দফতরে তাঁর সার্ভিস বুক আছে, প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে তিনি বেতন পান। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি শিক্ষক, স্কুলের নথিতে তিনি শিক্ষক, সরকারের কাছেও এত দিন তিনি শিক্ষকই ছিলেন। অথচ এখন সেই মানুষটিকেই আবার পরীক্ষার হলে বসে প্রমাণ করতে হবে, তিনি শিক্ষক থাকার যোগ্য কি না। পরীক্ষায় পাশ না করলে চাকরি নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। প্রশ্নটা তাই শুধু শিক্ষকের যোগ্যতার নয়; প্রশ্নটা সরকারেরও—যাঁকে এত বছর নিজের হাতে নিয়োগ দিয়ে, স্বীকৃতি দিয়ে, বেতন দিয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ করালেন, আজ হঠাৎ তাঁর কাছেই যোগ্যতার নতুন প্রমাণ চাইছেন কোন যুক্তিতে?
পশ্চিমবঙ্গ স্কুলশিক্ষা দফতর ১১ সেপ্টেম্বর স্কুল সার্ভিস কমিশন এবং প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদকে কর্মরত শিক্ষকদের টেট আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে বলেছে। সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিল, RTE আইন কার্যকর হওয়ার আগে নিযুক্ত যে শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ পাঁচ বছরের বেশি বাকি, তাঁদের টেট পাশ করতে হবে। পরে আদালত সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ৩১ আগস্ট ২০২৮ করেছে। যাঁদের চাকরি পাঁচ বছরের কম বাকি, তাঁরা অবসর পর্যন্ত ছাড় পাবেন; তবে পদোন্নতির জন্য তাঁদেরও টেট পাশ করতে হবে। শিক্ষা দফতর সূত্রের হিসাবে, রাজ্যে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষক এই নির্দেশের আওতায় পড়তে পারেন। আদালতের রায় রাজ্য সরকার অমান্য করতে পারে না। কিন্তু রায় কার্যকর করেই সরকার নিজের দায় শেষ করতে পারে না।
NCTE ২৩ আগস্ট ২০১০-এর বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতার অংশ হিসেবে টেটকে বাধ্যতামূলক করেছিল। কিন্তু যাঁদের নিয়োগের সময় এই শর্তই ছিল না, বহু বছর পরে তাঁদের চাকরি টিকিয়ে রাখার শর্ত হিসেবে সেই পরীক্ষা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠবেই। এই শিক্ষকেরা নিয়োগবিধি লেখেননি। সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, সরকার নির্বাচন করেছে, সরকার নিয়োগপত্র দিয়েছে, শিক্ষা দফতর অনুমোদন করেছে। তার পর সেই সরকারই তাঁদের দিয়ে বছরের পর বছর স্কুল চালিয়েছে। আজ যদি সরকার বলে, সেই শিক্ষক বা শিক্ষিকার যোগ্যতা যথেষ্ট নয়, তা হলে সরকারকেই আগে বলতে হবে—এত বছর যাঁদের দিয়ে স্কুল চালালেন, তাঁরা হঠাৎ অযোগ্য হলেন কী করে?

কিয়ের্কেগার্ডের নামে বহুল উদ্ধৃত একটি কথা আছে—জীবনকে পেছন ফিরে বোঝা যায়, কিন্তু বাঁচতে হয় সামনে এগিয়ে। আমাদের শিক্ষা-প্রশাসন যেন কথাটির এক অভিনব পাঠ নিয়েছে—চাকরি দিয়েছে আগে, যোগ্যতা যাচাই করতে নেমেছে পনেরো-কুড়ি বছর পরে।
এক দিনের যোগ্যতা পরীক্ষায় ব্যর্থতা বহু বছরের শিক্ষকতাকে মুছে দিতে পারে না। একজন শিক্ষক এত দিন ক্লাস নিয়েছেন, পরীক্ষা নিয়েছেন, খাতা দেখেছেন, সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কাজ ভালো না খারাপ, সরকার অবশ্যই তার মূল্যায়ন করতে পারে। সরকার প্রশিক্ষণ দিতে পারে, পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারে, নিয়মিত কাজের হিসাব চাইতে পারে। কিন্তু কাজের মূল্যায়ন আর নতুন করে চাকরিতে ঢোকার যোগ্যতা পরীক্ষা এক জিনিস নয়। চাকরি বাঁচানোর শর্ত হিসেবে বহু বছর পরে নতুন একটি পরীক্ষা চাপালে সরকার নিজের পুরনো নিয়োগের দায় শিক্ষকের ঘাড়ে ঠেলে দেয়।
এখানেই রাজ্যের ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের রাজনৈতিক দায় সবচেয়ে বেশি। ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপির নেতৃত্ব এই সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিল। শিক্ষকরা সেই আশ্বাস শুনেছিলেন। শিক্ষক সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরে আইন সংশোধন, কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ এবং পুরনো নিয়োগপ্রাপ্তদের সুরক্ষার দাবি তুলে আসছে। আজ পশ্চিমবঙ্গ এবং কেন্দ্র—দুই জায়গাতেই একই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায়। ফলে কলকাতা দিল্লির দিকে আর দিল্লি কলকাতার দিকে আঙুল তুলে দায় এড়াতে পারে না। তখন বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে সমাধান হবে। এখন ক্ষমতা এসেছে। তাই প্রশ্নটাও বদলেছে—কবে সমাধান করবেন নয়, এখনও করেননি কেন?
রাজ্য সরকার আদালতের নির্দেশ মানবে। কিন্তু সেই সঙ্গে বিধানসভায় প্রস্তাব আনতে পারে, কেন্দ্রের কাছে আইন সংশোধনের দাবি তুলতে পারে, পুরনো নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সুরক্ষার জন্য আদালতে স্পষ্টীকরণ চাইতে পারে। তামিলনাড়ু সরকার ২৩ আগস্ট ২০১০-এর আগে নিযুক্ত শিক্ষকদের টেট থেকে ছাড় দেওয়ার দাবিতে বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ করেছে এবং কেন্দ্রের কাছে RTE আইন সংশোধনের দাবি তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে সংসদে আইন সংশোধনের পথ খুঁজতে পারে। পুরনো শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি শুধু মঞ্চের বক্তৃতায় টিকে থাকে না; সরকারকে তার প্রমাণ দিতে হয় নথিতে, আদালতে এবং সংসদে।
এর সঙ্গে আরও একটি জরুরি প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ‘সব শিক্ষককে টেট দিতে হবে’—এই ঢালাও কথা অকারণে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। RTE এবং NCTE-র টেট কাঠামো মূলত প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণিকে কেন্দ্র করে। রাজ্যের নরমাল সেকশন, আপার প্রাইমারি সাব-সেকশন, নবম-দশম এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের অবস্থান এক নয়। শিক্ষা দফতরকে স্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানাতে হবে—কোন নিয়োগবর্ষের কোন শিক্ষক এই নির্দেশের আওতায় পড়বেন এবং কারা পড়বেন না। একজন কর্মরত শিক্ষক সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যম বা সংগঠনের ব্যাখ্যা শুনে নিজের চাকরির ভবিষ্যৎ আন্দাজ করবেন কেন?
সরকার আরও একটি কথা এড়াতে পারে না। প্রায় নব্বই হাজার শিক্ষককে চাকরি হারানোর আশঙ্কার মধ্যে রেখে সরকারি স্কুল স্বাভাবিকভাবে চলবে কী করে? বহু শিক্ষক পনেরো-কুড়ি বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। সকালে তাঁরা ক্লাস নেবেন, ছাত্রের খাতা দেখবেন, স্কুলের প্রশাসনিক কাজ সামলাবেন; বাড়ি ফিরে চাকরি বাঁচানোর পরীক্ষার বই খুলবেন। একে শিক্ষার মানোন্নয়ন বলা যায় না। শিক্ষককে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে ছাত্রের শিক্ষার মান বাড়ানোর কথা বলা স্রেফ মূর্খামি।
টেট থাকুক। নতুন শিক্ষক নিয়োগে কঠোর যোগ্যতামান থাকুক। সরকার নিয়মিত শিক্ষকতার মানও যাচাই করুক। কিন্তু পুরনো নিয়োগের দায় পুরনো শিক্ষকের ওপর চাপানো চলবে না। যে শিক্ষক সরকারের নিয়ম মেনে চাকরিতে ঢুকেছেন এবং বছরের পর বছর সেই দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁর চাকরি নতুন শর্তে ঝুলিয়ে দেওয়ার আগে সরকারকে নিজের দায় স্বীকার করতে হবে।
চাকরি বাঁচাতে একজন শিক্ষককে আবার পরীক্ষার্থী বানানো সহজ। তাঁর হাতে অ্যাডমিট কার্ড ধরিয়ে দিলেই প্রশাসনের কাজ শুরু। কিন্তু সরকারের সামনে প্রশ্নটি আরও কঠিন—যাঁদের এত বছর শিক্ষক বলে স্বীকার করেছেন, আজ তাঁদের চাকরি বাঁচাতে আপনারা কী করছেন?
শিক্ষকদের যদি টেটের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, সরকারের কাছেও একটি প্রশ্নের উত্তর বাকি আছে—ক্ষমতায় আসার আগে যে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এসে তার কী করলেন?
এই পরীক্ষার জন্য টেট লাগে না। লাগে নিজের কথার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা।
এখন দেখার, সেই যোগ্যতা সরকারের আছে কি না।

