শারদোৎসব মানেই বাংলার আকাশে-বাতাসে শিউলির সুবাস, মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাই আর দূরদূরান্ত থেকে ভেসে আসা ঢাকের বাদ্দি। এই শব্দ ছাড়া বাঙালির দুর্গাপূজা কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু ঢাকের এই উৎসবমুখর শব্দের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘশ্বাস, এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক যন্ত্রণার করুণ ইতিহাস। সম্প্রতি উলুবেড়িয়ার ধূলাসিমলার ‘রুইদাসপাড়া’ বা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘ঢাকিপাড়া’-র বাস্তব চিত্র আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সংস্কৃতির এই অন্যতম প্রধান কারিগররা আজ চরম অনিশ্চয়তা ও অবহেলার শিকার। উৎসবের মঞ্চে যাঁদের হাত ধরে প্রাণ পায় আনন্দ, উৎসব ফুরোলেই তাঁদের জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের দীর্ঘ ছায়া।
উলুবেড়িয়ার রুইদাসপাড়ার ৩৫টি পরিবারের প্রায় ১৬০ জন মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঢাক বাজানোর এই পারিবারিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন। শারদোৎসবের দিনগুলোতে তাঁরা ঢাক কাঁধে নিয়ে ছুটে যান বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে, অনুষ্ঠানে বা সরকারি কর্মসূচিতে। হিসাব বলছে, পুজোর মূল মরশুমে পাঁচ-ছ’দিনে একজন ঢাকির আয় মাত্র ৪ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে । বছরের বাকি সময় অন্যান্য পুজো বা অনুষ্ঠানে কিছু কাজ জুটলেও তা অত্যন্ত অনিয়মিত। এর ফলে বাধ্য হয়েই এই সম্প্রদায়ের মানুষ বিকল্প জীবিকার সন্ধান করতে শুরু করেছেন। কেউ জুতো সেলাই করছেন, কেউ ছাতা বা সবজি বিক্রি করছেন, কেউ বা অন্যের জমিতে খেতমজুরি করছেন। এমনকি নতুন প্রজন্মের যুবকরা ধূলাগড়ের গেঞ্জি কারখানা বা অন্য কোনো কারখানায় সামান্য বেতনের কাজ, কিংবা ফেরিওয়ালার পেশা বেছে নিচ্ছেন। যে ঐতিহ্য এককালে ছিল গর্বের, তা আজ পেটের দায়ে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

পুজো কমিটিগুলোর বাজেট হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়ছে ঢাকিদের পারিশ্রমিকের ওপর। বাজারে মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন ঢাকিদের মজুরি তো বাড়েনি, উল্টে তা সংকুচিত হয়েছে। প্রতিযোগিতার বাজারে কাজ হারানোর ভয়ে শিল্পীরা অনেক সময় নামমাত্র মূল্যে বায়না নিতে বাধ্য হন। ঢাক বাজানোর পাশাপাশি জুতো সেলাই বা দিনমজুরির সামান্য আয়ে টালির চালের ঘরে কোনোমতে দিন গুজরান করতে হয় তাঁদের। অথচ এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কোনো সুরক্ষাবলয় নেই।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও লোকশিল্পীদের রক্ষার জন্য সরকারের তরফ থেকে নানা প্রকল্পের কথা বলা হলেও, তার বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ঢাকিদের জন্য নির্ধারিত মাসিক এক হাজার টাকা ভাতার ক্ষেত্রেও চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত ছয় মাসে মাত্র দু’মাসের টাকা হাতে পেয়েছেন শিল্পীরা। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে ঢাক বাজাতে গিয়েও প্রাপ্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের বিরুদ্ধে। বারবার যোগাযোগ করেও সেই টাকা না মেলায় ক্ষোভ বাড়ছে শিল্পী মহলে।
পাশাপাশি, মৌলিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নটিও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ স্তরে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ঘর পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চনা, উন্নয়নের আলো থেকে আজও বহু দূরে রুইদাসপাড়ার মতো প্রান্তিক জনপদগুলি।
এই পরিস্থিতি কেবল কিছু মানুষের ব্যক্তিগত জীবিকার সংকট নয়, এটি বাংলার আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবক্ষয়ের একটি বড়ো লক্ষণ। রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনের আগে বা উৎসবের মরশুমে লোকশিল্পীদের নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও, উৎসব ফুরোলে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার খোঁজ কেউ রাখেন না। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে লোকশিল্পীদের জন্য বিশেষ ভাতা বা লোকসংস্কৃতি প্রসারের কথা বলা হলেও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের জটিলতা এবং দুর্নীতি সেই সুবিধা প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাই পারে বাংলার এই প্রাচীন শিল্প ও শিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। অন্যথায়, একদিন হয়তো দেখা যাবে, কেবল ইতিহাসের পাতাতেই বন্দি হয়ে রইল বাংলার সেই চিরচেনা ঢাকের বাজনার শব্দ।

