অক্টোবরের এই মাঝামাঝি সময়টা একটু অদ্ভুত। বাতাসে খানিক শীতের আমেজ লাগে, শুষ্ক হয়ে থাকা বাতাসে ছাতিমের গন্ধ মৃদু-মন্দ তালে ছড়াতে থাকে। দুগ্গা পুজোও এক পলকে শেষ হয়ে যায়। ঠিক এই সময়ে অনেকদিন আগে ফেলে আসা মূহুর্তগুলো মনের দরজায় আলতো করে কড়া নেড়ে যায়। মনটা খানিক ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে। এই ভারাক্রান্ত মন, ছাতিমের গন্ধ মনে করিয়ে দেয় প্রথম সবকিছু— প্রথম প্রেম, ভয় মেশানো শুষ্ক ঠোঁটের প্রথম স্পর্শ, প্রচন্ড আবেগে প্রথমবার খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরা, আরও কত কী!
প্রেম একটু অগোছালো হয়, একটু বোকা বোকা হয় আর প্রথম প্রেমে একটু বেশিই। কিন্তু এই অগোছালো, অনাড়ম্বর- এর মধ্যেই থাকে এক সরল মাধুর্য। মনে তখন সদ্য সদ্য বসন্তের হাওয়া লাগে। মনে হয় যেন পৃথিবীতে হয়তো কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, সবই যেন হাতের মুঠোয়। প্রথমবার প্রেমে পড়ে নেহাত কাঁচা হাতে দুটো কবিতা লেখা আর মনে কথা বলার অদম্য ইচ্ছা। অথচ, কথা বলতে গেলে সব এক্কেবারে গুলিয়ে গ হয়ে যায়।
এরপর কোনো একদিন কোনো একজন মারাত্মক সাহস নিয়ে বলে ফেলে ‘আমার তোকে ভালোলাগে’। উদ্দেশ তখন খানিকক্ষণ লজ্জায় কথা বলতে পারে না। একটা আলতো উষ্ণ হাতের ছোঁয়া পরিস্থিতিকে একটু তরল করে, একটু আশ্বাসিত করে। বাস্তব-পরাবাস্তব, অনেক অনেক জটিলতার মধ্যে তাদের নিজেদের একটা ছোট্ট জগত গড়ে ওঠে। সেখানে থাকে তাদের প্রথম আলাপের মুহূর্ত, প্রথম একসাথে বৃষ্টি দেখা, মাটির ভাঁড়ে চা খাওয়া, নন্দনে সিনেমা দেখা, ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ হওয়ার পর ছুটে দেখা করতে যাওয়া…
এই সরল, জটিলতা হীন প্রথম প্রেম আমাদের বেশিরভাগের জীবনেই হয়তো টেকে না ঠিকই, কিন্তু সেই মানুষটা, সেই সরল প্রেমটা আমাদের অনেককিছু শিখিয়ে দিয়ে যায়। আমরা আস্তে আস্তে বড় হতে শিখি, প্রিয় জিনিস ছেড়ে একা থাকতে শিখি, নিষ্ঠুর বাস্তবকে সহজ ভাবে গ্রহন করতে শিখি।
তারপর এভাবেই অনেক গুলো শীত কেটে যায়। আবার কোনো এক শীতে মানুষ আরেকবার ‘প্রথম প্রেম’এ পড়ে। এতগুলো বর্ষার পর আবার একবার হৃদয়ে বসন্তের রৌদ্র লাগে। হয়তো তখন কোনো অভিপ্রায়ই থাকে না প্রেমে পড়ার। শান্ত, নির্লিপ্ত শিশুর মতো গুটি গুটি পায়ে এসে পাশে বসে পড়ে। হাতে করে নিয়ে আসে তিনটি রঙের গোলাপ। তখনও ঠিক টের পাই না। কিন্তু যতক্ষণে টের পাই ততক্ষণে আমারা মায়ায় পড়ে যাই, অভ্যাস হয়ে যায়।
মানুষ ভালোবাসতে চায়, প্রচন্ড মন খারাপের দিনে কাউকে জাপটে ধরতে চায় কিন্তু কোনো উষ্ণ বক্ষ খুঁজে পায় না। কোনো এক নিঃস্তব্ধ শীতের সন্ধ্যায় আমাদের আর হয়তো ‘কাবেরী’ শোনা হবে না, একসঙ্গে জয় গোস্বামী পড়া হবে না… পাশে শুধু পড়ে থাকবে একটা ‘হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ ‘।

