রাষ্ট্র বলে- ‘মারো! ও মহিলা সাংবাদিক! “

৫৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

“I will do what I can and I will say what I should. These intolerant voices find strength in our silence. Let them learn to argue using words instead of threats”- Gauri Lankesh

দিল্লির যন্তর মন্তরের ধূলিমলিন চত্বর হোক কিংবা সুদূর দক্ষিণের কোনো উত্তাল রাজপথ—আজকের ভারতে স্বাধীন সাংবাদিকতার আকাশ জুড়ে নেমে এসেছে থ্রেট কালচারের কালো ছায়া। গণতন্ত্রের যে চতুর্থ স্তম্ভের কাজ ছিল শাসকের ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া, সেই স্তম্ভকেই আজ গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র চলছে। আর এই আক্রমণের মূল নিশানা হয়ে উঠছেন নারী সাংবাদিকরা। যন্তর মন্তরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মহিলা সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের নগ্ন নিগ্রহ, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট সেকশনে নেমে আসা অশালীন আক্রমণ—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। এগুলো আসলে ভয়ের এমন এক চাদর, যা দিয়ে সত্যের মুখ ঢেকে দিতে চায় স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্র। ​যে পুলিশ বা প্রশাসনের হাতে নাগরিকের জীবন ও সংবিধানের সুরক্ষার ভার ন্যস্ত, তারাই যখন রক্ষকের খোলস ছেড়ে ভক্ষকের ভূমিকা নেয়, তখন অসহায় জাতি বিচার চাইব কার কাছে?

দিল্লির যন্তর মন্তরে পুলিশের দ্বারা নিগ্রহের শিকার মহিলা সাংবাদিক৷ ছবি : ইন্টারনেট থেকে


পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রচেতনায় একজন স্বাধীনচেতা নারী যখন নির্ভয়ে ক্যামেরা বা কলম হাতে অন্যায়ের সামনে দাঁড়ান, তখন তা ক্ষমতার মসনদকে কাঁপিয়ে দেয়। আর সেই ক্ষোভ থেকেই তাদের ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক হিংসা। মনে পড়ে ২০১৭ সাল? গৌরী লঙ্কেশ? বেঙ্গালুরুর রাজরাজেশ্বরী নগরে নিজের বাড়ির সামনেই আততায়ীদের পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী গৌরী লঙ্কেশ। অপরাধ? মৌলবাদ, উগ্র হিন্দুত্ব ও জাতভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন কলম ধরেছিলেন গৌরী৷ সময় পেরিয়েছে, কিন্তু পাল্টায়নি গৌরির রক্তাক্ত সেই উত্তরাধিকার৷ তাই আজও রাজপথে মহিলা সাংবাদিকদের ওপর পুলিশি লাঠিচার্জ, হেনস্তা এবং ভয়ের রাজত্ব নেমে আসে প্রতিনিয়ত৷

গৌরি লঙ্কেশ


আসলে, প্রতিবাদ মানেই তো রাষ্ট্রের গায়ে লাগা অন্যায়ের কালো দাগ প্রকাশ্যে চলে আসা। প্রশাসন চায় না সেই প্রতিবাদের ছবি কোনো ক্যামেরায় বন্দি হোক বা কোনো সাংবাদিকের কলমে জীবন্ত হয়ে উঠুক।কারণ, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো জনরোষ, নির্বাচনী অনিয়ম বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার সত্য ছবি জনসমক্ষে পৌঁছানো মানেই টলে ওঠা শাসকের মসনদ ক্ষমতার অলিন্দে বসা শাসকরা ভালো করেই জানে, একটি সমাজ তখনই নতিস্বীকার করে যখন তার প্রতিবাদ করার ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়।ঘটনাস্থলে থাকে না পর্যাপ্ত মহিলা পুলিশ কর্মী বা সাংবাদিকদের নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট প্রটোকল। তাই আজ রাজপথে মহিলা সাংবাদিকদের ওপর আঘাত হেনে গোটা সমাজকে ত্রাসের মধ্যে বন্দি করতে চায় প্রশাসন।


যে পুলিশ বাহিনীর কাজ ছিল নিরপেক্ষ আইনরক্ষক হিসেবে জনতার সুরক্ষা রক্ষা – সেই পুলিশই আজ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বোরে৷

সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। ​এই ঐতিহ্যের রক্তে ভেজা মাটি আজ আবার সাক্ষ্য দিচ্ছে এক দীর্ঘ রাতের। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, বুলেটের মুখে বা লাঠির ডগায় কখনো সত্যের কণ্ঠ রোধ করা যায়নি। যন্তর মন্তরের পিচঢালা রাস্তায় কিংবা আটটা আটের বনগাঁ লোকালে, যতই অশালীনতার, নির্যাতনের বেয়োনেট তৈরি করা হোক না কেন, প্রতিবাদী নারীর কলম আজ আরও বেশি শাণিত। প্রশ্ন জাগে- রাষ্ট্রের এই হিংস্র প্রহরীরা কি তবে একদিন এই দেশের প্রতিটি মুক্তকণ্ঠকে স্তব্ধ করে তৈরি করবে এক নীরব শ্মশান নাকি জনতার ঐক্যবদ্ধ দ্রোহ গৌরী লঙ্কেশের দেখানো পথেই ছিনিয়ে আনবে এক নতুন ভোরের আলো?

অন্যান্য প্রতিবেদন.