দিল্লির অভিজাত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বিকানের হাউসে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পুত্র তথা তরুণ চিত্রশিল্পী রাইহান রাজীব ভাদ্রার প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘নো আইডিয়া ইজ ফাইনাল’ (No Idea Is Final) শুরু হওয়ার ঠিক আগে এক তীব্র রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রদর্শনীর উদ্বোধনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে কর্তৃপক্ষের তরফে রাইহানকে দিল্লির ছাত্র-যুব আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি এবং ভারতীয় জাতীয় পতাকা তথা ‘তিরঙ্গা’র ছবিগুলি প্রদর্শনী থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু শিল্পমহলই নয়, উত্তাল হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতিও।
প্রদর্শনী শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তে প্রায় ৭০টিরও বেশি ছবি দেওয়াল থেকে নামিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়। রাইহানের অভিযোগ, গত তিন বছর ধরে দিল্লির রাজপথে চলা বিভিন্ন ছাত্র-যুব আন্দোলনের যে দৃশ্যমান দলিল তিনি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন, সেগুলিকে ‘আপত্তিকর’ তকমা দেওয়া হয়। এমনকী, জাতীয় পতাকার দুটি ছবিও বাদ দিতে বলা হয়, যা মানতে অস্বীকার করেন শিল্পী। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফাঁকা দেওয়ালে খালি ফ্রেম এবং সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রতিলিপি ঝুলিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান তিনি।
যদিও বিকানের হাউস প্রশাসনের তরফে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কারণের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি এবং তাদের দাবি এটি পলিসির পরিপন্থী, তবুও নেপথ্যে যে রাজনৈতিক অস্বস্তি কাজ করেছে তা স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেশের রাজধানীতে ছাত্র-যুবদের যেকোনো ধরনের সরকার-বিরোধী আন্দোলন বা প্রতিবাদকে রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রশাসন এক ধরণের নিরাপত্তার ঝুঁকি বা আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখে থাকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বা সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলা সাংস্কৃতিক পরিসরগুলিতে শাসককুলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সংঘর্ষের কোনো দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা নিষিদ্ধ করার এক অঘোষিত প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, যে ছবিগুলিতে কোনো অবমাননাকর বা উস্কানিমূলক উপাদান নেই—কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি দৃশ্যগত দলিল তুলে ধরা হয়েছে—সেগুলিকে সেন্সর করার যুক্তি কোথায়? রাইহান ভাদ্রা নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, সমস্ত শিল্পই কমবেশি রাজনৈতিক এবং প্রতিবাদের ছবি তুলে ধরা কি অপরাধ?
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও বিরোধী শিবির তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, দেশে আজ আর গণতন্ত্র নেই এবং যুবসমাজের কণ্ঠস্বরকে পরিকল্পিতভাবে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কংগ্রেস শিবিরের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত, প্রতিবাদ এবং তার শৈল্পিক প্রকাশটুকুও সহ্য করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, আইএনসি লিগ্যাল সেল থেকে শুরু করে বিরোধী দলের একাধিক নেতা একে সরকারের অতিরিক্ত অসহিষ্ণুতা এবং ভয়ের বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন।
পক্ষান্তরে, শাসক শিবিরের একাংশের মতে, সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বা বিতর্কিত বিষয়বস্তুকে প্রদর্শনীর নামে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাদের মতে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের মঞ্চ বানানোর প্রবণতা রোধ করতেই এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
এই গোটা বিতর্কটি কেবল একজন তরুণ শিল্পীর ছবি সরিয়ে নেওয়ার সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি আধুনিক ভারতের পাবলিক স্পেস বা গণ-সাংস্কৃতিক পরিসরগুলিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সেন্সরশিপের সীমানা নিয়ে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের সমালোচনা, প্রতিবাদ এবং তার শৈল্পিক দলিল সংরক্ষণের পরিসর কতখানি সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, বিকানের হাউসের এই ঘটনা তারই একটি জলজ্যান্ত রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি। শিল্পীর ক্যানভাস থেকে প্রতিবাদের ছবি মুছে ফেলা হয়তো সাময়িকভাবে দৃশ্যমানতাকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু তা সমাজে অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক অসন্তোষকে দূর করতে পারে না।

