২০০৯ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর ২৪ পরগনা সহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে যে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, তার ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকোয়নি। সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর ২০১১ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার ক্ষতিগ্রস্ত দুই লক্ষাধিক মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। রেশনের মাধ্যমে মাসে ১৬ কেজি করে অতিরিক্ত চাল বিতরণের ‘স্পেশাল প্যাকেজ’ চালু করা হয়েছিল। দেড় দশক পর আজ সেই বরাদ্দই বন্ধের পথে। রাজ্য সরকারের খাদ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক এই ইঙ্গিত রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
খাদ্য দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ প্যাকেজের সম্পূর্ণ আর্থিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে রাজ্য সরকারকে। চালের দাম, পরিবহন খরচ এবং বিভিন্ন ভর্তুকি মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১২ কোটি টাকা খরচ হয়। গত দেড় দশকে এই প্রকল্পের পেছনে রাজ্যকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের যুক্তি, বিগত বছরগুলোতে যশ, আমফান কিংবা ইয়াসের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলাতে হয়েছে রাজ্যকে।
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী এই স্পেশাল প্যাকেজগুলির আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের একাংশের দাবি, বর্তমান রেশন ব্যবস্থায় সর্বজনীন বা আধার সংযোগের কাজ সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার পর এই বিশেষ অনুদানগুলি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনের অন্দরে আরও একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চাল বিক্রির প্রবণতা। সরকারি সূত্রের অভিযোগ, অধিকাংশ উপভোক্তা রেশনের এই বাড়তি চাল নিজেরা ব্যবহার না করে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। সরকারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ভর্তুকি যেখানে সরাসরি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থদের জীবনমান উন্নয়নে বা খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যবহার হওয়ার কথা, সেখানে তার অপব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এর আগেও বাম আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়েও এই বিশেষ প্যাকেজটি বন্ধ করার প্রশাসনিক চেষ্টা একাধিকবার হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। এবার খাদ্য দপ্তর সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সিদ্ধান্তকেই বাস্তবায়িত করার পথে হাঁটছে।
এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন রাজ্যের আর্থিক অবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা মহলে বিতর্ক চলছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি সরকারের এই পদক্ষেপকে জনবিরোধী ও গরিব মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, উপকূলবর্তী অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, ফলে এই চাল বন্ধ হলে বড় অংশের সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়বেন। অন্যদিকে, শাসক শিবিরের বক্তব্য—দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলা একটি পুনর্বাসনকালীন প্যাকেজকে অনন্তকাল চালিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত নয়, বিশেষ করে যখন এর সুফল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
সবমিলিয়ে, আয়লার বিশেষ চাল বন্ধের এই প্রক্রিয়া কেবল খাদ্য দপ্তরের হিসাবনিকাশের বিষয় নয়, বরং এটি বাংলার রাজনীতিতে জনকল্যাণ বনাম আর্থিক শৃঙ্খলার দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতেরই এক নতুন অধ্যায়।

