শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে কংগ্রেসকে পরোক্ষ মদত দিচ্ছেন। পড়ে অবাক লাগছে? কিন্তু অবাক লাগার কথা নয়।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি কংগ্রেস থেকে। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেস তৈরির কাজ শুরু হয়েছে ১৯৯৭ থেকে। ১৯৯৮-এ তৃণমূল কংগ্রেসের সৃষ্টি। কিন্তু কাঁথির নেতা শিশির অধিকারী অনেক পরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর তৃণমূল কংগ্রেসে ঢুকে পড়া। কিন্তু এগুলি আদৌ বিশেষ কোনো কারন নয়।
জাতীয় রাজনীতিতে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি’র প্রধান শত্রু কংগ্রেস। ‘ইন্ডিয়া’ নামক বিরোধী দলগুলির বোঝাপড়া-মঞ্চেও কংগ্রেস নিউক্লিয়াস। কিন্তু একই সঙ্গে আরএসএস-কে লাগাতার খেয়াল রাখতে হয় যে, কোনো ভাবেই যেন বামপন্থীরা প্রভাব বাড়াতে না পারে। এই সময়ের মধ্যেই আরএসএস-এর হিন্দুত্ববাদী দর্শনের বিরুদ্ধে দেশের তরুণ সমাজকে প্রবল বিরোধিতার অঙ্গনে দেখা যাচ্ছে। এই তরুণ সমাজের মধ্যে বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। রাজ্যেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে আরএসএস-এর বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের প্রবল বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। ফলে বামপন্থা যাতে কোনো ভাবেই তাদের হারানো প্রভাব ফিরে না পেতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হচ্ছে আরএসএস-বিজেপি’কে। কারন এই রাজ্যে অন্তত, বিজেপি-সঙ্ঘ বিরোধিতায় কংগ্রেসের সামান্য ভূমিকাও দেখা যাচ্ছে না। বিধান ভবন ঘুমিয়ে আছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জাতীয় রাজনীতির এই অঙ্ক শুভেন্দু অধিকারীকেও খেয়ালে রাখতে হচ্ছে। তার সঙ্গে আছে তাঁর নিজের পাটিগণিত।
বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল হওয়ার কথা ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। কিন্তু এই নামের কোনো দলই আপাতত রাজ্যে নেই। মমতা ব্যানার্জির প্রতিষ্ঠিত দল বিধানসভা নির্বাচনের পরে কয়েক দিনের মধ্যে তিন খন্ডে পরিণত হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জয়ী হয়েছিল। আপাতত মাত্র ১৬জন আছেন মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে। বাকিরা শুভেন্দু অধিকারীর পরামর্শে তৈরি ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ গড়েছেন। এদের কোনো প্রভাব রাজ্যের মানুষের মধ্যে নেই। যদিও বিধানসভায় এরাই বিরোধী হিসাবে প্রধান। হাস্যকর, কিন্তু এটিই বাস্তব।
বিধানসভায় বামপন্থীদের ১জন বিধায়ক। তিনি সিপিআই(এম)-এর। আইএসএফ-এর ১জন বিধায়ক। কংগ্রেসের ২জন বিধায়ক। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে যদি বিজেপি’র ফলাফল খারাপ হয়, অথবা যদি মাঝপথে আরএসএস রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বদল করতে চায়, তার প্রভাব রাজ্য বিধানসভায় পড়বে। নরেন্দ্র মোদীর বয়স ২০২৯-এ হবে ৭৯। তিনি এখনই বৃদ্ধ। তখন আরও বৃদ্ধ হবেন। দেশের মানুষের জীবন যন্ত্রণা গত ১২বছরে কমেনি। বরং বেড়েছে। গ্যাসের দাম থেকে পানীয় জল, বাড়ি, গ্রামের কাজের মতো দেশের প্রধান কোনো সঙ্কটেরই সমাধান কেন্দ্রের বিজেপি সরকার করতে পারেনি। প্রবল ধর্মীয় বিভাজন, কোনো তীব্র উগ্র জাতীয়তাবাদী জিগির ছাড়া ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’র ভালো ফল করা কঠিন। নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প খুঁজে বের করাও আরএসএস-বিজেপি’র কাছে খুব সহজ কাজ নয়। আর মাঝপথে মুখ্যমন্ত্রী বদল? এমন দৃষ্টান্ত বিজেপি’র ইতিহাসে ভুরি ভুরি। ত্রিপুরা, আসাম সহ অনেকগুলি রাজ্যে তারা মাঝপথে মুখ্যমন্ত্রী বদলে দিয়েছে। এই রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর মতো ‘আমিই শ্রেষ্ঠ’ মনোভাবের নেতাকে নিয়ে ইতিমধ্যেই আরএসএস, বিজেপি-তে উষ্মার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দিলীপ ঘোষ, শমীক ভট্টাচার্যদের মতো কৈশোর থেকে আরএসএস করা মানুষ বেশিদিন দ্বিতীয় সারিতে বসে থাকবেন, আর শুভেন্দু অধিকারীর মতো ‘আদপে তৃণমূলী’ লাগাতার ছড়ি ঘুরিয়ে যাবেন, তা হওয়া অস্বাভাবিক।

তৃণমূল কংগ্রেসকে বিধানসভার মধ্যে ভেঙে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। অন্তত ৬৪-৬৫জন ওই অংশের বিধায়ক তাঁর হাতে আছেন। যাঁদের মধ্যে ঋতব্রত ব্যানার্জির মতো দ্রুত উপরে ওঠার আকাঙ্খা দ্বারা তাড়ির কিংবা ফিরহাদ হাকিমের মতো প্রবল ক্ষমতার মানে কী, তা ১৫ বছর ধরে ভোগ করা মানুষ আছেন। মন্ত্রীত্ব পেলে এরা যে কোনও দিকে চলে যেতে পারেন। এদের লাটাই শুভেন্দু অধিকারীর হাতে। বিজেপি’র মন্ত্রী, বিধায়কদের মধ্যেও আরএসএস সব বিষয়ে হস্তক্ষেপে বিরক্ত একটি অংশ আছে। ২০২৯-এ বিজেপি কেন্দ্রে দুর্বল হলে বিজেপি থেকে বেরিয়ে আর একটি সরকার গড়ার কাজে তারাও শুভেন্দু অধিকারীর পাশে দাঁড়িয়ে যাবেন।
তখন আসবে ছাতার প্রশ্ন। শুভেন্দু অধিকারীর দরকার হবে একটি ছাতা— যার জাতীয় ক্ষেত্রে নামধাম আছে। আবার এমন একটি দল যা কমিউনিস্টদের বিরোধী। রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর প্রধান রাজনৈতিক পরিচয় তিনি কমিউনিস্টদের বিরোধী। তাকে এই ব্র্যান্ড বজায় রাখতেই হবে। তিনি কংগ্রেসের ছাতার নিচে চলে যেতেই পারেন। অধীর চৌধুরী ছাড়া শুভেন্দু অধিকারীর কংগ্রেসে ঢুকে পড়ায় বাঁধা দেওয়ার মতো নেতা রাজ্য কংগ্রেসে নেই। শুভেন্দু অধিকারী কংগ্রেসকে অনায়াসে কবজা করে বসতে পারবেন। সেই সময়ে কংগ্রেসের যে বিধায়করা আছেন, তাঁদের মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ হবে।
তাৎপর্যপূর্ণ হলো, উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামে কংগ্রেস এমন একজনকে প্রার্থী করেছে, যিনি দীর্ঘদিন শুভেন্দু অধিকারীর বিশ্বস্ত। ২০০৭-এর অভিযোগগুলির ভিত্তিতে রাজ্য পুলিশ শুভেন্দু অধিকারীর ইচ্ছায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করেছিল। শুভেন্দু অধিকারী নিজে ২০১৯ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসে, তাদের সরকারের মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন। তখন মিলনকে গ্রেপ্তারের কোনো চেষ্টাই তিনি করেননি। অথচ তখনও পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ, প্রশাসন তাঁরই তালুতে ছিল। এমনকি গত ৯ই মে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি মিলনকে গ্রেপ্তার করাননি। উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর গ্রেপ্তার করা হলো মিলন প্রধানকে। কে মিলন প্রধান? ২০০৭-এ নন্দীগ্রামে মাওবাদী, জামিয়তে উলেমা হিন্দ, কংগ্রেস, বিজেপি’র সঙ্গে মিলে তৃণমূল কংগ্রেস যে ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’ গড়েছিল, সেই কমিটি চলতো শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে। আর মিলন ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর আজ্ঞাবহ কংগ্রেস কর্মী। হিসাব করেই নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী হয়েছেন মিলন। গ্রেপ্তারও নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য মেনে। এই গ্রেপ্তারের হাওয়ায় নন্দীগ্রামে যদি কংগ্রেসের ভোটের হার বেড়ে যায়, তাহলে শুভেন্দু অধিকারীর দুটি লাভ।
প্রথমত, তিনি বোঝাবেন পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের শক্তি তিনি আটকে রেখেছেন। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর সুযোগ পাবে। যা শুভেন্দু অধিকারীর দরকার।

