বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

নহি ভোটার নহি ভোটার, আমি প্রাণী

৩০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

‘তুমি মাটির দিকে তাকাও, সে প্রতীক্ষা করছে,
তুমি মানুষের হাত ধরো, সে কিছু বলতে চায়।’

লিখে গিয়েছিলেন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আজ মাটি আছে, আজ মানুষ আছে, মানুষের প্রতীক্ষাও আছে, কিন্তু হাত ধরার লোক নেই। অর্থাৎ, যে নীতিনির্ধারকদের সাধারণ মানুষের হাত ধরতে পরোক্ষভাবে আহ্বান করেছিলেন কবি, সেই রাজারা, সেই নেতারা, সেই শাসকরা কি আদৌ সেই আহ্বান শুনলেন? এইরকমটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এক এক করে দেখা যাক।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা এনসিআরবির রিপোর্ট বলছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ভারতে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ২৬.৩৫ শতাংশ। আমাদের দেশে ২০০৫–২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১টি রাজ্যে মোট ২২০টি পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্ন ফাঁস, ভুয়ো পরীক্ষার্থী, ওএমআর কারচুপি ও ইলেকট্রনিক জালিয়াতির ফলে প্রায় ১০ কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরকম উদাহরণ লিখতে বসলে পেনের কালি এবং খাতার পাতা দুইই ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু লেখা শেষ হবে না। এদিকে এইসবের জেরে বাড়ছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। কিন্তু তারপরেও মজার বিষয় হল, শাসক খুব ভালোভাবেই জানেন, জনগণ ক্ষুব্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন যে ঘটবেই তার নিশ্চয়তা নেই। তবে, সরকার যে ধাক্কা খাবে না বা শেষ পর্যন্ত তার পতনও যে ঘটবে না, সে কথাও হলফ করে বলা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক পালাবদল তার একটা বড় উদাহরণ। এমনকি দেশজুড়ে ছাত্র-যুবসমাজের বিক্ষোভের মুখে পড়ে সদ্য প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও বহু জটিল প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভের অন্তর্নিহিত কারণ আসলে কী? দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর শাসক কেন সাধারণ মানুষের ক্ষোভের শব্দ শোনার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলেন? কেন তারা নাগরিকের হাত ধরেন না?

‘মানুষই ইতিহাস রচনা করে’

এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে প্রকাশিত একটি লেখায় শুভময় মৈত্র লিখছেন, ‘গত দেড় দশকে অনেকগুলো বড় মাপের নাগরিক আন্দোলন আমরা দেখেছি। তার মধ্যে যে দুটো আন্দোলন অ-বিজেপি সরকারের আমলে ঘটেছে— একটা ২০১১-অন্না হাজারের আন্দোলন, আর একটা ২০২৪-এর আর জি কর আন্দোলন— তাতে লাভবান হয়েছিল বিজেপি। উল্লেখ্য যে, এই দুই আন্দোলনের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র সেভাবে কোনও দমনমূলক ব্যবস্থা করেনি— এবং শেষ অবধি সরকার পড়ে গেছে। ফলে বিজেপি এখান থেকে শিক্ষা নিতেই পারে যে, ছাত্রবিক্ষোভের দাবির কাছে নতিস্বীকার না করে দমনমূলক কৌশল তাদের সংসদীয় স্থায়িত্বের পক্ষে সুবিধাজনক হবে। শাসকের দিক থেকে তাই বিক্ষোভকারীদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আরবান নকশাল’, ‘ডিপ স্টেট’ ইত্যাদি নামে দাগিয়ে দেওয়াটা একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ভাষা হওয়া অসম্ভব নয়।’ অর্থাৎ কী বুঝলেন? সরকারপক্ষ বারবার আন্দোলনকে দেশবিরোধী বলে দাগিয়ে দিয়ে এটা আপনার মাথায় গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে যে, এই গণআন্দোলনে যোগ দিলে আপনিও বৈদেশিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবেন। রাষ্ট্রবিরোধী হয়ে যাবেন। এতে সরকারপক্ষের বেশ সুবিধা। নিজের ব্যর্থতা স্বীকারও করতে হবে না। আবার আন্দোলনকে খুব সহজে অর্থহীন প্রমাণিত করে মানুষের ক্ষোভকে অন্যদিকে ঘুরিয়েও দেওয়া যাবে। কিন্তু উল্টোদিকে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে নিট পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন সরকারকে এও বুঝিয়ে দিল, চেনা সমীকরণ সবসময় টিকে থাকে না। শাসকদলের একাংশ যখন আন্দোলনকে দমিয়ে দিতে ক্রমাগত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বিদেশী যোগের তত্ত্ব প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন খোদ বিদেশমন্ত্রক জানিয়ে দিল, এই অভিযোগের সমর্থনে তাঁদের কাছে কোনও তথ্য নেই। আবার নিট-কাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে ধৃতদের মুক্তি দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কেন্দ্র, তা অগ্রাহ্য করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং অসমে একাধিক আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হয়। সরকারপক্ষ হয়তো ভেবেছিলেন, আন্দোলন শেষ। ফলে বিক্ষোভকারীদের ধরপাকড় নিয়ে মাথা ঘামাবেন না সিজেপি নেতৃত্বরা। কিন্তু হল ঠিক তার উল্টো। সিজেপি ফের জানিয়ে দিল, প্রতিশ্রুতি না রাখলে নতুন করে আন্দোলেনে নামবে ককরোচরা। ব্যাস, এখানেই সরকারের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। বিহারের পর অসম এবং পরবর্তীতে বাংলার সরকারও ধৃত আন্দোলনকারীদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

ককরোচদের মিছিলে ভগৎসিং


শাসনবিভাগ যখন এইভাবে সাধারণ নাগরিকের ক্ষোভে কান দেয় না, তখন মানুষ সাধারণত অন্য দুটি স্তম্ভের কাছে আশ্রয় খোঁজে—এক, বিচারবিভাগ এবং দুই, সংবাদমাধ্যম। কিন্তু গত কয়েক দশকে আদালতের প্রতি ভারতের মধ্যবিত্তের যে অতি-নির্ভরতা গড়ে উঠেছিল, সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা এবং আদালতের মন্তব্য সেই বিশ্বাসে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত যদি ‘ককরোচ’ মন্তব্যটি না করতেন, হয়ত এত বড় আন্দোলন ভারতে ঘটতোই না। সেইসঙ্গে হাই-প্রোফাইল বনাম সাধারণ মামলার মধ্যে বৈষম্য, সংবেদনশীল ঘটনায় পুলিশের গুলিবর্ষণে বিলম্বিত আইনি পদক্ষেপ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতার মতো ঘটনার কথাও বলা যেতে পারে। অন্যদিকে, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ অর্থাৎ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের ভরসা ক্রমেই তলানিতে ঠেকছে। যন্তর মন্তরে যা ঘটছে, তা মূলধারার টিভি চ্যানেলে একরকম দেখানো হচ্ছে, আর সমাজমাধ্যম ও স্বাধীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উঠে আসছে তার একদম বিপরীত ছবি। এই মুহূর্তে কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্প প্রতিবাদ, উত্তরাখন্ডে শিভালিক বন বাঁচাও প্রতিবাদ, পাঞ্জাবে ও গুজরাটে কৃষক আন্দোলন, মণিপুরে বিক্ষোভ, ছত্তিশগড়ে উচ্ছেদ অভিযান প্রতিবাদ, গোয়ায় কারাপুর-সারভান মেগা প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মহারাষ্ট্রে অ্যামাজন ডেটা সেন্টার প্রতিবাদ সহ দশটির কাছাকাছি গণআন্দোলন চলছে দেশজুড়ে। কটি মেনস্ট্রিম মিডিয়া এই খবর আপনাদের কাছে তুলে ধরছে?

যন্তর মন্তর

ভাবুন, যখন প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তাল গোটা দেশ, তখন ২০২৪ সালের নিট-ইউজিতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ধৃত সঞ্জীব মুখিয়াকে প্রমাণের অভাবে ক্লিনচিট দিচ্ছে সিবিআই। সেই ঘটনাই বা কটি মূলধারার সংবাদমাধ্যম আপনাদের কাছে তুলে ধরেছে? সাধারণ মানুষের ক্ষোভের জন্ম ঠিক এখানেই। শুধুই বিরোধী রাজনৈতিক চক্রান্তের কারণে কি এই আন্দোলন? একদমই নয়। এই অসন্তোষের প্রধান কারণ, আমাদের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিক্ষাসহ সমস্ত ব্যবস্থায় ঢুকে পড়া গভীর ক্ষত। একদিকে ইথানল-মিশ্রিত ই-২০ পেট্রোলের বাড়বাড়ন্তের কারণে গাড়ির মাইলেজ কমে যাওয়ার মতো ঘটনা যেমন সামনে আসছে। অন্যদিকে, ঠিক তেমনই দেখা যাচ্ছে গত ১১ বছরে ১৪৮টি প্রশ্নপত্রে জালিয়াতির ঘটনা, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ধারাবাহিক অনিয়ম ও দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ঘোর অনিশ্চয়তা, পড়াশোনার সঙ্গে পেশাগত দক্ষতার ব্যবধান বৃদ্ধি। দ্য ল্যানসেট ও অন্য বৈশ্বিক গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে দূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১৭ থেকে ২৩ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিস-এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ২০২৩ সালে দিল্লিতে যতজনের মৃত্যু হয়েছে, তার প্রায় ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দিল্লির দূষিত বায়ুর ভূমিকা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি সাতজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে দূষিত বায়ুর কারণে।

যমুনা দূষণ

সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে হয়তো এইসব বিষয়ে বিতর্ক এড়ানো যায়, কিন্তু তরুণের হতাশা আর আত্মহননের পরিসংখ্যানকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বিচারবিভাগ বা সংবাদমাধ্যম যখন এই প্রশ্নগুলি রোজ এড়িয়ে যাচ্ছে, তখন আপনি প্রশ্ন তুললেই ‘দেশদ্রোহী’ তকমাও কিন্তু পেয়ে যেতে পারেন! এই পরিস্থিতিতেই সোনম ওয়াংচুকের মতো অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনশন রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিয়েছে, নাগরিক কেবল একজন ‘ভোটার’ নন—তিনি প্রশ্ন তোলারও অধিকার রাখেন। যে কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতন্ত্রে রাষ্ট্র কিংবা শাসকের শক্তি কোনো স্থায়ী বিষয় নয়; গণতন্ত্রের প্রকৃত চালিকাশক্তি লুকিয়ে থাকে তার সাধারণ নাগরিকের সচেতন প্রশ্ন তোলার সাহসে। দমনপীড়নের কৌশল, ‘দেশদ্রোহী’ তকমার রাজনৈতিক খেলা কিংবা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের নীরবতা হয়তো সাময়িকভাবে সত্যকে আড়াল করতে পারে। কিন্তু মানুষের রুজি-রুটি, জীবন-জীবিকা এবং টিকে থাকার এই বাস্তব সংগ্রামকে চিরতরে চেপে রাখা যায় না। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই প্রতীক্ষারত মাটির বুকেই লুকিয়ে থাকে নতুন আন্দোলনের বীজ। ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে—শাসক যখন বধির হয়ে যায়, তখন অহিংস কিন্তু দৃঢ় গণআন্দোলনের সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের নিভতে বসা সলতেটিতে নতুন করে আলো জ্বালিয়ে তুলতে পারে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.