কালকের ভারতবর্ষ সাক্ষী থাকলো এক ঐতিহাসিক দিনের৷ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লি মুম্বাই কলকাতা- সর্বত্র৷
দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর চত্বর এই প্রতিবাদের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আম আদমি পার্টি (আপ), কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন যৌথভাবে ‘সংবিধান বাঁচাও’ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবিতে পথে নামে। আন্দোলন প্রতিহত করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত কঠোর ও অতিসক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। যন্তর মন্তর ও নয়াদিল্লির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা (পূর্বতন ১৪৪ ধারা) জারি করে সমস্ত ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়।
পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপের জেরে রাজধানীতে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সকাল থেকেই রাজীব চক, কেন্দ্রীয় সচিবালয়, প্যাটেল চকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। প্রতিবাদ থামাতে গিয়ে আপ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আতিশী এবং বাম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য-সহ শত শত রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্রনেতাকে আটক করে পুলিশ। বহু বিক্ষোভকারীকে জোর করে বা চ্যাংদোলা করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়, যা নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের গুরুতর অভিযোগ তোলে বিরোধী শিবির। তা সত্ত্বেও বিরোধী নেতারা ভোটদাতাদের অধিকার রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান৷

মুম্বইয়ে এই প্রতিবাদের রূপ ছিল কিছুটা ভিন্ন। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র উদ্যোগে ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে ‘জেল ভরো’ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। গান্ধী জয়ন্তীর দিনটিকে বেছে নিয়ে এই আন্দোলন শুরু হলেও মহারাষ্ট্র পুলিশ বম্বে হাইকোর্টের একটি পুরোনো নির্দেশকে সামনে রেখে এর অনুমতি দেয়নি। তা সত্ত্বেও শত শত মানুষ জমায়েত হলে পুলিশ কড়া ব্যবস্থা নেয়।আশ্চর্যের বিষয় হল, এই রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নামী অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, সুরকার বিশাল দাদলানি এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি আন্দোলনকে এক ভিন্ন মাত্রা ও নাগরিক সমাজের অভূতপূর্ব সমর্থন এনে দেয়।
দিল্লি ও মুম্বইয়ের পাশাপাশি কলকাতার রাজপথেও এর প্রভাব পড়ে। বামপন্থী দলগুলি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে এবং ভোটপ্রক্রিয়াকে ধ্বংস করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে জোরালো মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও মনে করছে যে, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
কলকাতা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন গোয়া, বেঙ্গালুরু এবং রাঁচিতেও এই প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ে, যা প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের নয়, বরং এটি একটি জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
এই সমস্ত প্রতিবাদের মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে সাম্প্রতিক নির্বাচন কমিশনের কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ এবং এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত কার্যকলাপের মধ্যে। বিরোধী শিবির দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, দেশের স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ভোটপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলে বিরোধী দলগুলি সোচ্চার হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন এই সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে খণ্ডন করেছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের কার্যপ্রণালীতে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অঙ্গ মাত্র। শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকেও এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্টান্ট বলে অভিহিত করে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
এই সামগ্রিক ঘটনাবলি ভারতীয় গণতন্ত্রের বর্তমান স্বাস্থ্য এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দিল্লি এবং মুম্বইয়ের মতো মেট্রোপলিটন শহরগুলিতে যেভাবে পুলিশি বাধা ও গণ-গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে, তাতে আগামী দিনে কেন্দ্র ও বিরোধী শিবিরের সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ—মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন—যদি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, তবে তা ভারতীয় রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এই আন্দোলন কেবল জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষার এক বৃহত্তর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

