জন্তরমন্তরে SIR বিক্ষোভ: আটক পাঁচ শতাধিক আন্দোলনকারী

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শুক্রবার (২ অক্টোবর, ২০২৬) রাজধানী দিল্লির জন্তরমন্তরে এক উত্তাল বিক্ষোভের সাক্ষী থাকল দেশ। Special Intensive Revision বা SIR প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্রছাত্রী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। কিন্তু এই গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশের অতি-তৎপরতা এবং পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটকের ঘটনা দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
​সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে পরিচালিত SIR কর্মসূচি ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। বিরোধী দল ও ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে পরিকল্পিতভাবে প্রান্তিক, সংখ্যালঘু এবং বিশেষ কিছু অঞ্চলের ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে—যা এক ধরনের ভোটার ছাঁটাইয়ের সমতুল্য। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখা যেখানে জরুরি, সেখানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য কমিশন কাজ করছে—এমন অভিযোগ তুলে সরব হন আন্দোলনকারীরা।

জন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীরা


​শুক্রবার মহাত্মা গান্ধীর জন্মজয়ন্তীর পবিত্র দিনে জন্তরমন্তরে সমবেত হয়ে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা। ​এদিনের বিক্ষোভে কেবল বামপন্থী বা স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠনগুলিই নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষা করার লড়াইয়ে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ একসঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-র নেহা বোরা, প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী ও স্বরাজ ইন্ডিয়ার নেতা যোগেন্দ্র যাদব সহ এসএফআই (SFI), এনএসইউআই (NSUI) এবং অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। যুবসমাজ ও ছাত্রদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও আজ গভীর সংশয় ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।


​প্রতিবাদ সমাবেশ চলাকালীন দিল্লি পুলিশ কঠোরহস্তে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। কোনো রকম ছাড় না দিয়ে নেহা বোরা, যোগেন্দ্র যাদবসহ প্রায় ৫০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে চাওয়া নাগরিকদের ওপর এই ধরনের নির্বিচারে আটক ও দমনপীড়নের ঘটনা দেশের মৌলিক অধিকার এবং বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।

AISA নেত্রী নেহা বোরা কে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাচ্ছে দিল্লি পুলিশ


বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে ওঠা কোনো ধরনের জনমতকে দাবিয়ে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। জন্তরমন্তরের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদস্থলে এই ধরনের ধরপাকড় ভারতের গণতন্ত্রের সহনশীলতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এই আন্দোলন কেবল জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।


​একদিকে যখন শাসকপক্ষ প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিবাদ স্তব্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে তখন রাজপথের লড়াই প্রমাণ করছে যে নাগরিক সমাজ ও ছাত্রসমাজ সহজে হাল ছাড়তে নারাজ। আগামী দিনে এই আন্দোলন বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপ নেবে কি না এবং নির্বাচন কমিশন এই গুরুতর অভিযোগগুলির কি সন্তোষজনক জবাব দেবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একথা নিশ্চিত যে, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার না হলে এই ধরনের অসন্তোষ কেবল দিল্লির জন্তরমন্তরেই আটকে থাকবে না, বরং তা সারা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক গভীর পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.