“বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও” – এক প্রহসন। জামুইয়া ঘটনায় ফের প্রশ্নের মুখে দেশের নারী সুরক্ষা

৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো তার নাগরিকদের জীবন ও সম্মানের অবিকল সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু জামুইয়ের রোজকার পথ যখন স্কুলগামী মেয়েদের কাছে ভয়ের চোরাবালি হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সামাজিক চুক্তি বা ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ আজ কোন অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। সম্প্রতি বিহারের জামুই জেলায় ঘটে যাওয়া এক জঘন্য ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে নারীর সুরক্ষা কেবল আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক এবং সমাজতাত্ত্বিক সংকট ।


গত ১৯ সেপ্টেম্বর বিহারের জামুইয়ে এক কিশোরীকে যৌন হেনস্তা করা হয় এবং তার এক পুরুষ বন্ধুকে নৃশংসভাবে মারধর করা হয়। এই ঘটনার একটি ভিডিও পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও জনরোষ সৃষ্টি হয় । স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতায় তিনজনকে প্রথমে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয় । জামুইয়ের পুলিশ সুপার বিশ্বজিৎ দয়াল জানিয়েছেন যে এই বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত চলছে । তবে প্রশাসন দাবি করলেও, স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা এবং ক্ষোভ সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে৷


স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওই নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার সময় স্কুলগামী ছাত্রী থেকে শুরু করে পরিবারের নারীদের নিয়মিত হেনস্তার শিকার হতে হয় । দিনের পর দিন এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও এতদিন প্রশাসনের টনক নড়েনি। বর্তমান ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরেই কেবল পুলিশি তৎপরতা দেখা গেছে, যা বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন ফেলে। ঘটনার যেরে দশরথ রাম, বাধ্য হয়ে তাঁর নাতনিকে স্কুল পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন । একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’-এর মতো স্লোগান দেওয়া হয়, সেখানে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হওয়া একটি দেশের কঙ্কালসার মুখটিকেই তুলে ধরে৷


ভারতের রাজনীতিতে নারীর নিরাপত্তা সব সময়ই একটি বড় নির্বাচনী এজেন্ডা হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলি নারী সুরক্ষার বিষয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও তৃণমূল স্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ব্যর্থতা বারবার প্রকট হয়ে ওঠে। বিহারের মতো রাজ্যে অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব প্রায়শই দেখা যায়। অপরাধীরা যখন রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার ছত্রচ্ছায় কিংবা প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যায়, তখন এই ধরনের অপরাধমূলক প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পায়।
​বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ ঘটার পর পুলিশি তল্লাশি বা গ্রেফতারি কেবল আইনি প্রক্রিয়া, কিন্তু অপরাধ রোধ করার ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।


জামুইয়ের এই ঘটনা শুধু একটি নির্দিষ্ট অপরাধের চিত্র নয়, এটি আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার প্রতীক। সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতার এই হাহাকার রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক গ্রেফতারি বা আইনি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; নারীদের জন্য একটি নিরাপদ, ভয়হীন এবং সম্মানজনক পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। যতদিন না সাধারণ মানুষ রাস্তায় নিরাপদ বোধ করছে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত সমস্ত উন্নয়নের দাবি এবং রাজনৈতিক স্লোগান অর্থহীন হয়ে থাকবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.