বাঙালিকে লেনিন পড়ালেন যিনি

১,৭১৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

তৎকালীন উত্তর কলকাতার স্বাধীনতাসংগ্রামের গনগনে আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে, যখন শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির পাশাপাশি রাজপথের মিছিলে হাঁটছে শয় শয় খেটে খাওয়া মজুর শ্রমিক কৃষকেরা – তখন সুদূর বলসেভিকের মাটি থেকে চিঠি আসত কলকাতায়৷ দত্ত বাড়ির ঠিকানায়৷ হ্যাঁ, ভ্লাদিমির লেনিন, স্বয়ং চিঠি লিখতেন উত্তর কলকাতার এক বাঙালি যুবককে৷


ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত৷ সাধারণ মানুষের কাছে তিনি বহু ক্ষেত্রে যুগস্রষ্টা স্বামী বিবেকানন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবেই বেশি পরিচিত। কিন্তু এই পরিচয় ছাপিয়ে তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ছিল এক দীপ্তিময় বহ্নিশিখার মতো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংযোগ এবং মার্কসীয় দর্শনের আলোকে ভারতীয় সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি যে পথ তৈরি করেছিলেন, পরবর্তীতে তা নবপ্রজন্মকে নতুন দিশা দেখায়।

ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত


ভূপেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদের হাত ধরে। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি স্বনামধন্য জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘যুগান্তর’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিস্টার নিবেদিতা, অরবিন্দ ঘোষ ও ব্যারিস্টার পি. মিত্রের সান্নিধ্যে এসে তাঁর মননে দেশপ্রেমের আগুন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ‘সোনার বাংলা’ নামক একটি ব্রিটিশবিরোধী প্যামফ্লেট প্রকাশের অপরাধে ১৯০৭ সালে তাঁকে কারাবাস করতে হয়।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আত্মগোপন করে আমেরিকা পাড়ি দেন। আমেরিকার ‘ইন্ডিয়া হাউজ’ ও উদীয়মান গদর পার্টির সংস্পর্শে এসে তিনি সমাজতান্ত্রিক দর্শনে দীক্ষিত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ইউরোপে চলে যান এবং জার্মানির বার্লিন কমিটির সচিব হিসেবে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় বিপ্লবী কার্যকলাপ ছড়িয়ে দেন। প্রতি পদক্ষেপে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে চলা সেই জীবন ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক আন্তর্জাতিক সংহতির অনন্য উদাহরণ।

ভূপেন্দ্রনাথের এই আন্তর্জাতিক অভিযাত্রায় তাঁর পাশে ছিলেন এমন কিছু উজ্জ্বল অথচ আজ প্রায়-বিস্মৃত বিপ্লবী। ভূপেন্দ্রনাথের চেয়ে আট বছরের ছোট বীরেন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলন চলাকালীন স্কুল ছেড়ে জাতীয় শিক্ষা পরিষদে (অধুনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। পরবর্তীতে আমেরিকায় এবং বার্লিন কমিটিতে যোগ দিয়ে তিনি অভূতপূর্ব সাহসিকতার পরিচয় দেন। তুর্কি সেনার হয়ে সুয়েজ খাল রক্ষার যুদ্ধে মেজর পদ পাওয়া এবং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুতর আহত হওয়া বীরেন্দ্রনাথকে পরবর্তীতে হিটলারের জার্মানির আন্ডারগ্রাউন্ড সেলেও কাটাতে হয়েছিল।


সরোজিনী নাইডুর ভাই বীরেন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন স্বাধীনচেতা কমিউনিস্টদের অন্যতম পথিকৃৎ। লন্ডনে আইসিএস পরীক্ষা দিতে গিয়ে ব্রিটিশবিরোধী প্রচার শুরু করা বীরেন প্যারিস, জার্মানি ও স্টকহোমের গণ্ডি পেরিয়ে সোজা পৌঁছান সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায়। তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) গঠনে ও কোমিন্টার্নের কাজে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৩৭ সালে স্তালিন জমানার রাজনৈতিক অস্থিরতায় সিক্রেট পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে তাঁর জীবন রহস্যের অন্ধকারে হারিয়ে যায়।


১৯২১ সালে জার্মানি ছেড়ে ভূপেন্দ্রনাথ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় পা রাখেন এবং সরাসরি ভ্লাদিমির লেনিনের সংস্পর্শে আসেন। ভারতের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লেনিনের কাছে একটি বিস্তারিত রিপোর্টও জমা দেন তিনি। রাশিয়া থেকে দেশে ফিরে কুড়ির দশকের মধ্যভাগে তিনি বাংলা চষে বেড়ান কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে।

বাম দিকে ভূপেন্দ্রনাথ ও ডানদিকে ভ্লাদিমির লেনিন


​কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে বারবার কৃষক ও শ্রমিকের না অধিকারের কথা তুলে ধরা ভূপেন্দ্রনাথ ব্যক্তিগতভাবে কোনো দলের প্রথাগত সদস্যপদ না নিলেও তাঁর সিমলেপাড়ার বাসভবন হয়ে উঠেছিল বাম-গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর। সরোজ মুখার্জি, বিনয় চৌধুরীর মতো পরবর্তী প্রজন্মের অজস্র দিকপাল কমিউনিস্ট নেতা তাঁরই হাতে তৈরি হয়েছেন। জীবনের শেষপর্যন্ত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং কৃষক সভার শীর্ষ দায়িত্বে থেকে তিনি মেহনতি মানুষের অধিকারের লড়াই চালিয়ে গেছেন। ১৯৬০ সালে তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় ভারতীয় সাম্যবাদের এক বীরত্বপূর্ণ আদিঅধ্যায়।


স্বামী বিবেকানন্দের রক্ত বহমান ছিল যাঁর ধমণীতে, সেই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত কেবল এক রাজনৈতিক সংগঠকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙা এক মুক্ত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

অন্যান্য প্রতিবেদন.