ডিগ্রির ভিড়ে শিক্ষক কোথায়?

৪৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

কিছু খবর কেবল খবর নয়, কিছু খবর আমাদের সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের বিএড কলেজগুলিকে ঘিরে সাম্প্রতিক পরিদর্শন এবং তার পর উঠে আসা নানা তথ্য আমার কাছে ঠিক তেমনই এক আয়না। সেই আয়নায় শুধু কয়েকশো প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামোগত দুর্বলতা বা প্রশাসনিক অনিয়মের ছবি ধরা পড়ছে না; ধরা পড়ছে শিক্ষক তৈরির গোটা ব্যবস্থার প্রতি আমাদের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা। আরও বড় প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষক তৈরি করছি, নাকি শুধু শিক্ষক হওয়ার একটি কাগজ তৈরি করছি?

রাজ্যের ৬০২টি বিএড কলেজে জুলাই ও আগস্ট মাসে পরিদর্শনের পর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, বহু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক উপস্থিতি, পরিকাঠামো, শিক্ষার্থী উপস্থিতি, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ৪৫০টি প্রতিষ্ঠানকে শো-কজ করার কথা বলা হয়েছে এবং ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে কার্যত অযোগ্য বা অকার্যকর অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কোথাও নির্ধারিত ঠিকানায় কলেজের অস্তিত্বই মেলেনি, কোথাও তালা ঝুলেছে, আবার কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্য ব্যবসা চলার অভিযোগও সামনে এসেছে। যদি পরিদর্শনে উঠে আসা এই তথ্যগুলি যথাযথ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তবে প্রশ্নটা শুধু ওই প্রতিষ্ঠানগুলির দিকে নয়—প্রশ্নটা আমাদের নজরদারি ব্যবস্থার দিকেও। এতদিন ধরে তাহলে আমরা কী দেখছিলাম? একজন শিক্ষক তৈরি করার প্রতিষ্ঠান যদি নিজেই শিক্ষার ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে না পারে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষকের হাতে আমরা কোন ভবিষ্যৎ তুলে দিচ্ছি?

শিক্ষক হওয়া আর শিক্ষকতার একটি ডিগ্রি অর্জন করা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একটি সার্টিফিকেট কাউকে B.Ed. পাশ করাতে পারে, কিন্তু একজন মানুষকে শিক্ষক করে তুলতে পারে না। শিক্ষক তৈরি হন দীর্ঘ অনুশীলনে, শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতায়, বইয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মধ্যে, শিক্ষার্থীর মন বোঝার ক্ষমতায় এবং সর্বোপরি শিক্ষাকে কেবল পেশা নয়, দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতায়। তাই কোথাও যদি ক্লাসরুমের পরিবর্তে কাগজে-কলমে উপস্থিতি, প্রশিক্ষণের পরিবর্তে আনুষ্ঠানিকতা এবং শিক্ষার পরিবর্তে শুধুই ডিগ্রি অর্জনের ব্যবস্থা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। কারণ এর প্রভাব একটি কলেজের সীমানায় আটকে থাকে না। আজ যে প্রশিক্ষণহীন মানুষটি শিক্ষকতার যোগ্যতার কাগজ হাতে নিয়ে বেরিয়ে যাবেন, আগামীকাল তিনিই হয়তো একটি শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়াবেন। তাঁর সামনে থাকবে এমন কিছু শিশু, যাদের চিন্তা, জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব তাঁর হাতে। সেখানে একজন অযোগ্য শিক্ষকের ভুলের প্রভাব একটি পরীক্ষার নম্বরের চেয়েও অনেক বড় হতে পারে।


তবে একই সঙ্গে একটি বিষয়ও স্পষ্ট থাকা দরকার অভিযোগ এবং প্রমাণ এক জিনিস নয়। কোনও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। যথাযথ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। কারণ প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের শাস্তি যেন নির্দোষ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ না হয়ে ওঠে। যে ছাত্র বা ছাত্রী পরিবারের সঞ্চয় খরচ করে, নিজের স্বপ্ন নিয়ে বিএড পড়তে এসেছে, সে কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার জন্য দায়ী নয়। কোনও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে, অনুমোদন বাতিল হলে বা বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের স্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনাও থাকা জরুরি।

আরও একটি প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদি সত্যিই অন্য রাজ্য থেকেও পড়ুয়ারা পশ্চিমবঙ্গে এসে বিএড পড়ে থাকেন, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে কেন? কীভাবে তাঁরা পড়ছেন? নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে কি? তাঁদের internship বা teaching practice যথাযথভাবে হচ্ছে কি? পরীক্ষার ব্যবস্থাই বা কতটা বাস্তবসম্মত? এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য নয়, গোটা দেশের শিক্ষক-শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন দুর্বলভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষক কোনও একটি রাজ্যের সমস্যা নন; তিনি যেখানে যাবেন, সেখানকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গে তাঁর কাজ জড়িয়ে যাবে। তাই এই ঘটনাকে শুধুমাত্র ‘বিএড কলেজের বিরুদ্ধে অভিযান’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা পড়বে না। বরং এটিকে শিক্ষক-শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। আমার কাছে আসল প্রশ্ন বিএড কলেজ কতগুলি, তা নয়। আসল প্রশ্ন তার মধ্যে কতগুলি সত্যিই শিক্ষক তৈরি করছে? কতগুলি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস হয়? কতগুলি কলেজে যোগ্য ও সক্রিয় শিক্ষক আছেন? কতগুলি লাইব্রেরি সত্যিই শিক্ষার্থীদের কাজে লাগে? কতগুলি প্রতিষ্ঠানে practical এবং teaching practice-কে গুরুত্ব দেওয়া হয়? কতগুলি শিক্ষার্থী বাস্তবে বিদ্যালয়ে গিয়ে পাঠদানের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন? কতগুলি কলেজে একজন প্রশিক্ষণার্থী শুধু পরীক্ষায় পাশ করার জন্য নয়, একজন দক্ষ শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য প্রস্তুত হন? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই আসলে একটি বিএড কলেজের মান নির্ধারণ করবে।

সরকারের বর্তমান পদক্ষেপ তাই শুধু শাস্তিমূলক হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত সংস্কারের সূচনা। যে প্রতিষ্ঠান সত্যিই অনিয়ম করেছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন। যে প্রতিষ্ঠান কিছু নির্দিষ্ট ঘাটতির কারণে পিছিয়ে রয়েছে, তাকে সময়সীমা দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আর যে প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে ভালো কাজ করছে, তাদের স্বীকৃতি ও উৎসাহ দেওয়াও জরুরি। কারণ ভালো ও খারাপ প্রতিষ্ঠানকে একই মাপকাঠিতে বিচার করলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই শিক্ষার্থী, যে সত্যিই পড়তে চায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগ যেন কয়েকটি পরিদর্শন, কিছু শো-কজ এবং কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। আজ পরিদর্শন হল, কাল ব্যবস্থা নেওয়া হল, তারপর কয়েক বছর সব আগের মতো চলল এমন হলে এই সমস্ত পরিসংখ্যানের কোনও স্থায়ী মূল্য থাকবে না। দরকার নিয়মিত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক নজরদারি। দরকার এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষক উপস্থিতি, শিক্ষার্থী উপস্থিতি, পরিকাঠামো, internship, practical training এবং academic activities নিয়মিত মূল্যায়িত হবে। এমন একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থাও দরকার, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার আগে জানতে পারবেন তিনি যে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছেন, সেটি সত্যিই মানসম্পন্ন কি না। কারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে সংখ্যা কখনও মানের বিকল্প হতে পারে না। প্রতি বছর কত হাজার বিএড ডিগ্রি দেওয়া হল এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু সেই ডিগ্রিধারীদের মধ্যে কতজন একটি শিশুকে শুধু উত্তর মুখস্থ না করিয়ে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারবেন, কতজন তাকে ভাবতে শেখাবেন, ভুল থেকে উঠে দাঁড়াতে শেখাবেন, পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে শেখাবেন সেটিই শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য।

আজ তাই প্রশ্নটা আরও সরল করে করা দরকার—আমরা কি শিক্ষক তৈরি করছি, নাকি শুধু শিক্ষকের যোগ্যতার কাগজ তৈরি করছি? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের কাছে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়েরও আছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থারও আছে, কলেজ কর্তৃপক্ষেরও আছে। এমনকি আমাদের সমাজের কাছেও আছে। কারণ শিক্ষককে যদি আমরা কেবল একটি চাকরির পরীক্ষায় বসার যোগ্যতা হিসেবে দেখতে শুরু করি এবং B.Ed.-কে যদি কেবল চাকরিতে প্রবেশের একটি সার্টিফিকেটে নামিয়ে আনি, তাহলে শিক্ষক-শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। একজন ভালো শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের সম্পদ। তাঁর প্রভাব একটি শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস বদলাতে পারেন, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাতে পারেন, কখনও কখনও একটি প্রজন্মের চিন্তাধারাও বদলে দিতে পারেন। বিপরীতে, একজন অযোগ্য শিক্ষক শুধু নিজের দায়িত্বেই ব্যর্থ হন না তাঁর ব্যর্থতার ছায়া পড়তে পারে বহু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের উপর।

তাই এখন সময় এসেছে বিএড কলেজের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করার বদলে ভালো শিক্ষক তৈরির মান নিয়ে কথা বলার। একটি কলেজের বড় ভবন, সুন্দর নাম কিংবা কাগজে-কলমে থাকা পরিকাঠামো দিয়ে শিক্ষক তৈরি হয় না। শিক্ষক তৈরি হয় জীবন্ত শ্রেণিকক্ষে, প্রশ্নের মধ্যে, অনুশীলনের মধ্যে, শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংযোগের মধ্যে এবং শিক্ষার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার ভিতর দিয়ে। আমি চাই, এই পরিদর্শনের পরে শুধু কয়েকশো বিএড কলেজের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত না হোক। নির্ধারিত হোক পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক-শিক্ষার ভবিষ্যৎও। কোনও প্রতিষ্ঠান যেন ‘ডিগ্রি তৈরির কারখানা’ হয়ে উঠতে না পারে। কারণ একটি সার্টিফিকেট দেওয়া সহজ; কিন্তু একজন সত্যিকারের শিক্ষক তৈরি করা কঠিন। আর শেষ পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্ত আলোচনা, সমস্ত পরিসংখ্যান, সমস্ত নিয়ম-কানুন পেরিয়ে আমাদের ফিরে তাকাতেই হবে সেই মানুষটির দিকে—যিনি একদিন একটি শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়াবেন। তাঁর হাতে থাকবে শুধু একটি চক বা কলম নয়; থাকবে একদল শিশুর স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ। সেই মানুষটিকে আমরা কী দিচ্ছি—একটি ডিগ্রি, নাকি সত্যিকারের শিক্ষক হয়ে ওঠার শিক্ষা? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, আগামী দিনের শিক্ষক কেমন হবেন। আর তাঁর হাত ধরেই তো তৈরি হবে আগামী দিনের সমাজ।

অন্যান্য প্রতিবেদন.