নকশী কাঁথা: বাঙালি নারীর নীরব প্রতিরোধ ও জীবনের আলেখ্য কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নাগরিকত্ব যাচাই ও হয়রানির সংকট, ভাষার বুলডোজার! বাংলা থেকে আমেরিকান ক্যাপিটালিজম: সিয়ারসাকারের দাসত্ব ও আভিজাত্যের ইতিহাস অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম বালাঘাটে শিশুমৃত্যু,স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা ও বৈগা আদিবাসী সংকট এক বছরের মধ্যে, RSS পরিচালিত ১০০০টি স্কুল খোলার লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী : শিক্ষার গেরুয়াকরণ? মনসুন ওয়েডিং: এক পশলা বৃষ্টিতে ধোয়া সম্পর্কের হিসেব অনুদান কোটি কোটি, প্রার্থী মোটে ১৫! গুজরাটের বেনামী দলগুলোর আড়ালে কি বিশাল কর ফাঁকির খেলা?

অবৈধ মাইনিং এবং পরিবেশ উদাসীনতায় ডুবছে আসাম

৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম প্রতিবছরই বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল অতিবৃষ্টির ফল হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে প্রশাসনিক ঔদাসীন্য, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং অবৈধ খনি বা মাইনিংয়ের মতো মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। বিশেষ করে আসামের শিবসাগর জেলা এবং নাগাল্যান্ড সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে যে নজিরবিহীন বন্যা দেখা দিয়েছে, তা কেবল সাধারণ জলচ্ছ্বাস নয়; এর পেছনে রয়েছে পরিবেশ ধ্বংসকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের এক জটিল জাল।

​আসামের শিবসাগর জেলার নেপালিখুতি গ্রামের মতো জনপদগুলো অতীতে কখনোই এমন ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সর্বগ্রাসী জলরাশি সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই বন্যায় প্রায় ৫০ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং সম্পূর্ণ গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়। ঐতিহ্যগতভাবে আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও তার উপনদীগুলোতে বন্যার প্রকোপ পুরোনো হলেও, সাম্প্রতিক এই বিপর্যয়ের তীব্রতা এবং এর অপ্রত্যাশিত ভৌগোলিক বিস্তার প্রমাণ করে যে এর পেছনে সাধারণ মৌসুমী বৃষ্টির চেয়ে বড় কোনো কারণ লুকিয়ে রয়েছে।


​এই বন্যার মূল কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে নাগাল্যান্ড ও আসাম সীমান্ত এলাকায় চলা অবাধ ও অবৈধ খনি বা মাইনিং কার্যক্রম। পাহাড়ি অঞ্চলে নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে কয়লা এবং অন্যান্য খনিজ উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে বর্ষার সময় পাহাড়ি ঢলের সাথে বিশাল পরিমাণ পলিমাটি, বালি এবং পাথুরে কণা নিচে নেমে এসে নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলছে। নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জল উপচে প্লাবিত হচ্ছে সংলগ্ন জনপদগুলো।
​স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ খননকার্য চলে আসছে। পরিবেশ আইন এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রশাসনিক নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড থামানো সম্ভব হয়নি। এর মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ প্রান্তিক মানুষকে, যাদের জীবন ও জীবিকা আজ ধ্বংসের মুখে।

বন্যা কবলিত আসাম

​আসামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নদী ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী রাজনীতির একটি বড় ইস্যু হয়ে আসছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্থায়ী বন্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নদী বাঁধ নির্মাণ, পলি অপসারণ (ড্রেজিং) এবং অববাহিকা ব্যবস্থাপনার নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও তার সঠিক ব্যবহার নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটব্যাংক রাজনীতি এবং কর্পোরেট বা সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাতের বলি হচ্ছে আসামের সাধারণ মানুষ।

​এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল ত্রাণ বিতরণ বা ক্ষয়ক্ষতি পূরণের রাজনীতি দিয়ে কাজ চলবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর নীতিগত পরিবর্তন- সীমান্ত অঞ্চলে চলা সমস্ত অবৈধ খনি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং এর সাথে জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
আসাম ও নাগাল্যান্ড সরকারকে যৌথভাবে নদী অববাহিকা রক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করতে হবে।
পাহাড় কাটা এবং নদীখাদ বিকৃত করার যেকোনো উদ্যোগ কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন টিকতে পারে না, তা নীতিনির্ধাতাদের অনুধাবন করতে হবে।

​আসামের সাম্প্রতিক বন্যা সংকট কেবল প্রাকৃতিক কোনো প্রকোপ নয়, এটি মূলত পরিবেশগত অপরাধ এবং রাজনৈতিক অবহেলার এক সম্মিলিত ফল। যতক্ষণ না পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংকটের মূল কারণ অর্থাৎ অবৈধ খনিজ উত্তোলন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, ততক্ষণ আসামের মানুষের এই দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই।

অন্যান্য প্রতিবেদন.