খাদ্য নিরাপত্তা বনাম জ্বালানি নীতি! ভারতের চিনির সংকটের নেপথ্যে আসল সত্যিটা কী?

৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে চিনির বাজারমূল্য এবং জ্বালানি নীতি এক জটিল সংকটের মুখে পড়েছে। উৎসবের মরসুমের আগে বাজারে চিনির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের তথ্য

ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধুমাত্র ইথানল নীতি এককভাবে দায়ী নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে বিরূপ আবহাওয়া এবং সরকারের কিছু ত্রুটিপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত।

জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে ভারতে চিনির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ২১ জুলাই যেখানে অল-ইন্ডিয়া মডেল রিটেইল প্রাইস (All-India Model Retail Price) ছিল ৪৫ টাকা প্রতি কেজি, সেখানে ৩১ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ টাকায় এবং আগস্টের শেষের দিকে তা প্রায় ৬৫ টাকা প্রতি কেজিতে পৌঁছায়।
উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকের মতো প্রধান চিনি উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোতে মিলগেট প্রাইস প্রতি কেজি ৪৬ টাকা থেকে একলাফে বেড়ে ৬০ থেকে ৬৪ টাকার ওপরে চলে যায় ।


চিনির দাম বৃদ্ধির পর পরই বাজারে একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে, ইথানল ব্লেন্ডিং পেট্রোল (EBP) কর্মসূচিই এর জন্য দায়ী । তত্ত্ত্বগতভাবে মনে করা হয়েছিল যে, আখের রস বা ইথানল উৎপাদনে চিনি সরিয়ে নেওয়ার কারণে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে ।


তবে তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চিনির দামের সাথে ইথানলের সরাসরি কোনো বড় যোগসূত্র নেই । নভেম্বর ২০২৫ থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলো যে ৮১০ কোটি লিটার ইথানল পেয়েছে, তার মাত্র ৩২% এসেছে আখ থেকে । বাকি ৬৮% ইথানলই এসেছে খাদ্যশস্য থেকে— যার মধ্যে রয়েছে ভুট্টা, খাদ্য কর্পোরেশনের (FCI) উদ্বৃত্ত চাল এবং ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যশস্য । অতীতেও এর চেয়ে বেশি পরিমাণ চিনি ইথানলের জন্য ব্যবহৃত হলেও তখন এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

তাহলে চিনির দাম বাড়ার আসল কারণ কী? এর পেছনে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ:
এক, গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং দেরিতে বর্ষা বিদায় নেওয়ার ফলে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও গুজরাটের আখের ক্ষেত জলমগ্ন হয়ে পড়ে । পর্যাপ্ত সূর্যালোকের অভাবে আখের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং সুক্রোজের (Sucrose) পরিমাণও হ্রাস পায় ।


দুই, ভারতের বৃহত্তম চিনি উৎপাদনকারী রাজ্য উত্তরপ্রদেশে প্রধান আখ চাষের জাত ‘CO0238’ লাল পচন রোগ (Red Rot) এবং টপশ্যুট বোরার (Topshoot Borer) পোকার আক্রমণের শিকার হয় ।


​এই সমস্ত কারণে উৎপাদন প্রাক্কলন মারাত্মকভাবে ধাক্কা খায় এবং নিট চিনি উৎপাদন নেমে আসে ২৭.৯ মিলিয়ন টনে, যা আমাদের বার্ষিক অভ্যন্তরীণ consumo (২৮ মিলিয়ন টন)-এর নিচে । এর ফলে উদ্বৃত্ত বা বাফার স্টক ২০০৮-০৯ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে এসে ঠেকেছে ।


​কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, খারাপ ফসলের পাশাপাশি সরকারের অপরিপক্ক নীতি বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে ।ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যেই যখন মিলগুলো কাঁচা আখের অভাবে বন্ধ হতে শুরু করেছিল, তখনই সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারত । কিন্তু তা না করে ১৩ মে সম্পূর্ণ রফতানি নিষিদ্ধ করা হয় ।
অবশেষে ২০ আগস্ট সরকার ১ মিলিয়ন টন কাঁচা চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেয়, যা অনেক আগেই করা উচিত ছিল । বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ঘাটতি মেটাতে সরকারের আরও বেশি পরিমাণে পরিশোধিত চিনি (Refined Sugar) আমদানির অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন ছিল ।

ভারতের ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচি (E20 লক্ষ্যমাত্রা) দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও আখের উৎপাদন সেই গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি ]। বর্তমানে ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই শস্যভিত্তিক, বিশেষ করে এফসিআই-এর উদ্বৃত্ত চাল এবং ভুট্টা থেকে আসছে ।​এফসিআই-এর চাল অত্যন্ত কম দামে (খোলা বাজারের তুলনায় অনেক কম দামে) ইথানল প্রস্তুতকারকদের সরবরাহ করা হচ্ছে ।​এর ফলে বিপুল পরিমাণে ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার করে উৎপাদিত খাদ্যশস্য জ্বালানিতে পরিণত হচ্ছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।

ভারত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেখানে শক্তি বা জ্বালানি নীতির সাথে খাদ্য নিরাপত্তাকে সুষমভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি৷ E20 বা পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকে

অন্যান্য প্রতিবেদন.