কলকাতা থেকে শুরু করে মুম্বাই, দিল্লি থেকে চেন্নাই—ভারতের প্রতিটি মেট্রোপলিটন শহরের ধমনীতে মিশে আছে এক উপেক্ষিত জনজাতি। শহরের মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়া মুখ। ফুটপাতবাসী। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় নিয়ে যারা কংক্রিটের ফুটপাতকে নিজেদের একমাত্র ঠিকানা বানিয়েছেন। রাষ্ট্র যখন কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘শেল্টার হোম’ তৈরি করে, তখন প্রশ্ন জাগে—কেন পেটের টানে ফুটপাতে কাটানো মানুষগুলো সেই ছাদের নিচে আশ্রয় নিতে চান না?
অধিকাংশ ফুটপাতবাসী হকার, দিনমজুর, ভ্যানচালক, রিকশাচালক কিংবা ভাগার থেকে প্লাস্টিক কুড়ানি। তাদের আয়ের প্রতিটি পয়সা সরাসরি শ্রমের সঙ্গে যুক্ত।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি শেল্টার হোমগুলো শহরের উপকণ্ঠে বা মূল বাণিজ্যিক এলাকা থেকে বহু দূরে অবস্থিত। কর্মক্ষেত্র থেকে শেল্টার হোমের দূরত্ব এতটাই বেশি যে, প্রতিদিন সেখানে যাতায়াত করা তাদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে।
ভোরবেলা বাজারে কুলিগিরি করা বা গভীর রাতে কাজ শেষ করা মানুষের জন্য শেল্টার হোমের গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় এক অদৃশ্য জেলখানার মতো। জীবন যখন জীবিকার টানে নিয়মের তোয়াক্কা করে না, তখন রাষ্ট্রের ঘড়ি মেলানো নিয়ম তাদের কাছে হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার অন্তরায়।রাষ্ট্রীয় সাহায্য বা কল্যাণমূলক প্রকল্প অনেক সময়ই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং যান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে বন্দি থাকে।
ফুটপাতে থাকা পরিবারগুলো একসঙ্গে কষ্ট সহ্য করলেও একে অপরের শক্তি। অথচ বহু শেল্টার হোমে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা থাকার কঠোর নিয়ম রয়েছে।
ফুটপাতের খোলা আকাশ হয়তো শারীরিক কষ্ট দেয়, কিন্তু সেখানে তারা স্বাধীন। অন্যদিকে, চার দেওয়ালের মাঝে সিসিটিভি ক্যামেরা, কড়া নজরদারি এবং রক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ তাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে। বেঁচে থাকার ন্যূনতম মর্যাদাবোধের সঙ্গে এই আপস তারা করতে পারেন না।

শেল্টার হোম না যাওয়ার পেছনে পরিকাঠামোগত ঘাটতি একটি বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা। শহরের মোট গৃহহীন জনসংখ্যার তুলনায় আশ্রয়স্থলের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।ফলত, অনেক শেল্টার হোমে অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত শৌচাগার এবং নিকাশি ব্যবস্থার অবনতির কারণে এমন এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয় যা ফুটপাতের চেয়েও বিপজ্জনক।
প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু শেল্টার হোম কার্যত রাজনৈতিক ও সামাজিক অব্যবস্থাপনার আখড়ায় পরিণত হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের অধিকার গৌণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফুটপাত কেবল ইট-পাথরের পথ নয়, এটি এক দীর্ঘশ্বাস ও সংগ্রামের চিত্র। রাষ্ট্র যখন ওপর থেকে তাদের ওপর নিয়ম চাপিয়ে দেয়, তখন তা যেন এক ধরনের শ্রেণিগত ঔদ্ধত্য বলে মনে হয়। ফুটপাতে মানুষ বেঁচে থাকে মাটির কাছাকাছি থেকে, আর শেল্টার হোমগুলো তাদের পরিচয় কেড়ে নিয়ে কেবল একটি ‘পরিসংখ্যান’ বানিয়ে দিতে চায়।
জীবিকার সংকট এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে যতক্ষণ না রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে মানবিক, কর্মমুখী এবং বিকেন্দ্রীভূত আশ্রয় ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, ততক্ষণ কংক্রিটের এই বিরামহীন ফুটপাতই তাদের কাছে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকবে। ফুটপাতবাসীদের শেল্টার হোমে না যাওয়ার অনীহা কোনো জেদ নয়, হয়তো এটি বেঁচে থাকার অধিকারের এক মৌন প্রতিবাদ।

