রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই বেশ কয়েকবার ‘হিন্দুত্ব’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে শিল্পের উপর। গত কয়েকদিনে এমনই কিছু ঘটনার সাক্ষী থেকেছে বাংলা। থিয়েটার এমন একটি শিল্প মাধ্যম যেখানে যতটা বাস্তবসম্মত মঞ্চে দেখানো যায় ততই তার কদর বাড়ে। কিন্তু সম্প্রতি সেখানেও নাক গলানোর নজির মিলেছে একদল ‘মাতব্বরের’ যারা আদপে থিয়েটার দর্শক বা কর্মী নন। এখন প্রশ্ন হল যেখানে রাজ্য সরকার বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা ধর্মে মুসলমান তসলিমা নাসরিনকে ডেকে এনে সাদরে আপ্যায়ন করছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সওয়াল আলোচনা করছে-সেখানে শিল্পের উপর রঙ-ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া স্ববিরোধী হয়ে যায় না কি?
এর আগেও নন্দনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছবিতে ছয়লাপ ছিল। কিন্তু অ্যাকাডেমির গায়ে হাত পড়েনি। বিজেপি সরকার বাংলায় আসার পর গত ১২ জুলাই অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের মূল গেটের পাশের টিকিট কাউন্টারটির রঙ গেরুয়া করে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, শমীক ভট্টাচার্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি সমন্বিত ব্যানার লাগানো হয়েছিল। পাশে রাখা হয়েছিল ভারতমাতার ছবিও। সেইসময় এই ঘটনা নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। প্রতিবাদ করেছিলেন নাট্যকর্মীরা। অ্যাকাডেমিকে গেরুয়াকরণের বিরুদ্ধে রাজ্যসভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে চিঠিও লেখা হয়েছিল। তিনি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলেও এই একমাসে প্রশাসনের তরফে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। অবশেষে মঙ্গলবার নাট্যকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগেই টিকিটঘরের রঙ আগের অবস্থায় ফেরাতে সচেষ্ট হন। রঙ তুলি এনে সাদা করে দেন অ্যাকাডেমির ওই অংশের রঙ। উল্লেখ্য আগে ওই টিকিটঘরটির রঙ ছিল টেরাকোটা।

আরেকটি সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যাক। বাঘাযতীনে সমরেশ বসুর লেখা ‘আদাব’ নাটকটির অভিনয় চলছিল। নাটকের আবহ সংগীত হিসেবে আজানের সুর ভেসে আসতেই ধুন্ধুমার বাঁধান স্থানীয় কিছু ‘দাদা’ ।নাটকে কেন আজানের সুর বাজবে এই ছিল তাদের দাবি। এটি একটি নির্বাক নাটক। কোনও ডায়লগ নেই। আবহই এই নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। নাটকের পরিচালক তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন শুধু আজান নয়, মন্দিরের ঘণ্টার আওয়াজও রয়েছে। শান্তভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা বলে, শান্তির কথা বলে তাদের বোঝানো হলেও কে শোনে কার কথা! পরে দর্শকদের মিলিত প্রতিরোধে পিছু হঠে তারা।
আবার এই একই সময়ে গত ২৮ জুলাই নাটকের শো শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন নাট্যকর্মী শুভঙ্কর দাস শর্মা। তাঁর পরনে ছিল কালো পাজামা-পাঞ্জাবি। তাঁর পোশাক দেখেই ৪ জন দুষ্কৃতী তাঁকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করতে থাকে তিনি মুসলমান কিনা। শুভঙ্কর উত্তর দেন , ‘আমি মুসলিম হলে কী হবে?’ শুভঙ্করের যুক্তি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে অপরিচিত কোনও ব্যক্তিকে তিনি ধর্মপরিচয় জানাতে বাধ্য নন। এরপরেই তাঁকে নিরস্ত্র এবং একা পেয়ে বেধড়ক মারধর শুরু করে দুষ্কৃতীরা। ছিঁড়ে দেওয়া হয় তাঁর কালো পাঞ্জাবি। মাটিতে ফেলে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি আওড়াতে আওড়াতে তাঁকে ফেলে মারা হয়।

অতএব পর এই তিনটি ঘটনায় একটা জিনিসেরই পুনরাবৃত্তি হয়েছে তা হল চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। সঙ্গে বাংলায় ‘মুসলিম বিদ্বেষ’-এর এক অদ্ভুত ভয়ানক রূপ সামনে আসতে শুরু করেছে যা আগে এতটা প্রকট ছিল না। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এই সব ক্ষেত্রেই অশান্তি যারা করেছেন তারা নাট্যকর্মী হওয়া তো দূরস্ত, নাটকের নিয়মিত দর্শক কি না সন্দেহ! অথচ তারাই ঠিক করে দিতে চাইছেন কে কী পরবে, কে কী বলবে, কে কী খাবে বা কে কী শুনবে। যেই বাংলা পুষ্ট হয় রবীন্দ্র নজরুলের লেখায়, রূপম ইসলামের রক গানের সঙ্গে পাল্লা দেয় অনুপম রায়ের মেলোডি, জয়া আহসানকে সবচেয়ে মানায় অনির্বাণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে- সেই বাংলাকে কি ধর্ম দিয়ে ভাগ করা যায়? মুক্ত চিন্তার উপর গেরুয়া রঙ করে দেওয়া যায়? উত্তর হল না। আর তাইই ঘটনার নিন্দাও হচ্ছে, হচ্ছে প্রতিরোধও।

