‘চিনতে নাকি সোনার ছেলে ক্ষুদিরামকে চিনতে? রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে মুক্ত বাতাস কিনতে’
পরাধীন দেশে নিজের আত্মবলিদানের দিন আজ ক্ষুদিরাম বসুর। এই মুহূর্তে জেনজি-দের আন্দোলন খুবই চর্চায়। পরাধীন ভারতে ক্ষুদিরাম এমন একটি নাম যিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফাঁসির মঞ্চে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু ফাঁসির দড়ি গলায় পরার আগে অবধিও এই নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আক্ষেপ ছিল না। তাঁর এই মহান আত্মত্যাগকে যারা কুৎসিত ‘বার খাওয়া’ শব্দের সঙ্গে জুড়ে দেন তাঁদের আগে উচিৎ ক্ষুদিরামকে ভাল করে জানা। ছেলে বেলা থেকেই বাপ-মা হারা ক্ষুদিরামের দেশপ্রেম ছিল সবকিছুর উর্ধ্বে।
১৯০৮ সালে তাঁর আত্মবলিদানের ঠিক পরের দিন অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখার বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘মজঃফরপুর, ১১ আগস্ট অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে। ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়। এমন কি তাহার মাথার ওর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল।’ স্বদেশের জন্য মৃত্যুকে কিভাবে হাসিমুখে বরণ করতে হয় তা শিখিয়েছিল ক্ষুদিরাম বসু।

বিপ্লবী চেতনা ছোট থেকেই তাঁর মজ্জায় মজ্জায়। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই কলেরা রোগীদের সেবা করার জন্য দিন রাত এক করে দিয়েছিলেন। পরের দিন স্কুলে গিয়ে ঢুলে পড়তেই মাস্টারমশাই বেত্রাঘাত করেন কিশোর ক্ষুদিরামের হাতে। চুপচাপ সহ্য করে সে। স্কুলে গিয়ে ঘুমোনো ভুল, তাই তার আঘাত চুপচাপ সহ্য করে নেন ক্ষুদিরাম। তার সহপাঠীরা যখন মাস্টারমশাইকে বলেন ক্ষুদিরাম কী জন্য ঢুলছিল ততক্ষণে কিশোরের হাত বেত খেয়ে টকটকে লাল। মাস্টারমশাইয়ের বুক গর্বে ভরে উঠেছে
কখনও লোভ, বিলাসবহুল জীবনের হাতছানি তাঁকে তার লড়াই থেকে সরাতে পারেনি। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অরবিন্দ ঘোষ এবং বারীন্দ্রকুমার ঘোষের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ‘অনুশীলন সমিতি’ এবং ‘যুগান্তর’ দলের সাথে যুক্ত হন। ১৯০৬ সাল ক্ষুদিরামের বয়স তখন মাত্র ১৬। ব্রিটিশবিরোধী ইশতেহার বিলি করার সময় প্রথম গ্রেফতার হয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। কিন্তু সেবার পালিয়ে যেতে সমর্থ হন তিনি।
পরে তাঁকে পরাধীন ভারতের যন্ত্রণা ক্রমেই শেষ করে দিতে থাকে। ব্রিটিশ সরকারের কলকাতা প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড সেই সময় ভারতীয় বিপ্লবীদের উপর অকথ্য অত্যাচার করছেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি দিচ্ছেন। ক্ষুদিরামদের কাছে এই নামটি অহস্য হয়ে উঠেছিল। তাঁকে মারতে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারের মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডের গাড়ি লক্ষ্য করে তারা বোমা নিক্ষেপ করেন। দুর্ভাগ্যবশত, সেদিন গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না; এতে আইনজীবী কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা নিহত হন। পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন দুজনেই। প্রফুল্ল চাকি ধরা পড়ে আত্মহত্যা করেন, আর ক্ষুদিরামকে ফাঁসির সাজা শোনায় ব্রিটিশ সরকার।
দেশের জন্য মৃত্যু বরণ যে কত সহজ এবং স্বাভাবিক তা তাঁর নির্বিকার মুখ প্রমাণ করেছিল। তাঁর শেষ ইচ্ছা কী জিজ্ঞেস করায়, ক্ষুদিরাম উত্তর দিয়েছিলেন “আপনি যদি আমায় একটু সময় দেন, তাহলে দেশের ছেলেদের বোমা তৈরির কৌশলটা শিখিয়ে দিতে পারি।” আজ যখন দেশের যুবসমাজ আবার এক হয়েছে নিজেদের দাবি দাওয়া, হকের চাহিদায়। তখনও মনে হয় এরা আসলে ক্ষুদিরামদেরই উত্তরসূরী। মাত্র ১৮ বছর বয়সে যে আপস না করে সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাই প্রতিটি সাহসী দেশপ্রেমিক কিশোরই আজ একজন ক্ষুদিরাম।

