মুসলমান সম্প্রদায়ের নারীদের মধ্যে পর্দা প্রথার প্রচলন রয়েছে। তাঁরা কখনও হিজাব কখনও বা নিকাব ব্যবহার করে থাকেন। ইরানের অধিকাংশ এলাকায় নারীদের চুল বা মুখ কালো ওড়না কিংবা নিকাবে ঢেকে রাখা খুবই পরিচিত একটি দৃশ্য। দক্ষিণ উপকূলজুড়ে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর আশপাশের নারীরা একটি ঐতিহ্যবাহী মুখোশ ব্যবহার করে থাকেন। নানা রঙের সুতো, পুঁতি, চুমকি দিয়ে সাজানো হয় সেই মুখোশ। শত শত বছর ধরে এই মুখোশ তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।
‘বোরেগেহ’ বা ‘বোরকেহ’ নামে পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী মুখোশগুলি মূলত ব্যবহার করে থাকেন বান্দারি জনগোষ্ঠীর নারীরা। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য অনুসারে তৈরি এই অনন্য মুখোশগুলো মেয়েরা সাধারণত বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর আগেই বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো পরতে শুরু করে। এই মুখোশগুলিকে বলা হয় ‘বোরেগেহ’ বা ‘বোরকেহ’ মুখোশ।

বোরেগেহ মুখোশ তৈরি এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে জানতে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে নারীদের বিশ্বাস অর্জন করে একটি ছবির সিরিজ বানিয়েছিলেন ফরাসি আলোকচিত্রী এরিক ল্যাফোরগ। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানতে পারেন বোরেগেহ মুখোশ শিয়া ও সুন্নি—উভয় সম্প্রদায়ের মুসলিম নারীরাই ব্যবহার করেন। তবে দুই সম্প্রদায়ের মুখোশের নকশায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। শিয়া নারীরা সাধারণত লাল রঙের আয়তাকার বোরেগেহ পরেন, আর সুন্নি নারীদের মুখোশ সাধারণত কালো বা সোনালি রঙের হয়।

গ্রামের নারীরা হাতে সেলাই করেই এই মুখোশ তৈরি করে থাকেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বোরেগেহ এসব অঞ্চলের বহু নারীর ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু একটি মুখোশ নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক।

কেন বোরগেহ মুখোশ পরেন নারীরা ?
কেউ কেউ পরেন ঐতিহ্যবাহী গোঁফ আকৃতির মুখোশ। এই বিশেষ নকশার মুখোশ নারীর চেহারায় এক ধরনের কঠোর ও রহস্যময় আবহ তৈরি করে। লোককথা অনুযায়ী অনেক বছর আগে এই গোঁফ-আকৃতির নকশা তৈরি করা হয়েছিল শত্রু বা আক্রমণকারীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। দূর থেকে যেন নারীদের পুরুষ সৈনিক বলে ভুল হয়, সেই কৌশলেই এই স্বতন্ত্র নকশার প্রচলন হয়েছিল বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।

এছাড়াও ব্যবহারিক দিক থেকে আরও একটি কারণ পাওয়া যায়। উপকূল অঞ্চলে তীব্র রোদ , উচ্চ তাপমাত্রা এবং সমুদ্র থেকে আসা ধুলাবালিমিশ্রিত প্রবল বাতাসের প্রকোপ থাকে সেই থেকে বাঁচতেও উপকূল অঞ্চলের নারীরা মুখের একাংশ ঢেকে রাখতেন। পরে এই মুখোশই তাঁদের সাংস্কৃতিক পরিচয় হয়ে ওঠে।
তবে সময়ের সঙ্গে আধুনিক হচ্ছে দুনিয়া। নিত্যনতুন পোশাক ব্যবহারের হিড়িক বাড়ছে। অনেক উপকূলীয় জনপদের নারী এখনও এই ঐতিহ্যবাহী মুখোশ পরেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সংস্কৃতি এভাবেই জিইয়ে রেখেছেন ওই দেশের নারীরা।

