মালদার আদিনা মসজিদ বহুদিন ধরেই বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। হিন্দু সুরক্ষা সমিতির দাবি, আদিনা মসজিদ আসলে একটি প্রাচীন আদিনাথ শিবমন্দিরের ওপর নির্মিত। সেই দাবিকে সামনে রেখেই সংগঠনটি মসজিদের ভেতরে পূজার অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। যদিও এএসআই, ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এমন দাবির পক্ষে এখনও পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি।
গত ২৭ জুলাই, শ্রাবণের প্রথম সোমবার উপলক্ষে হিন্দু সুরক্ষা সমিতি তারকেশ্বর থেকে প্রায় দেড় টন ওজনের একটি পাথরের শিবলিঙ্গ মালদায় নিয়ে আসে। পরে সেটি আদিনা মসজিদের সংরক্ষিত এলাকার বাইরে একটি স্থানে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করা হয়। সংগঠনের নেতারা জানান, আদালতের অনুমতি না পাওয়ায় আপাতত বাইরে অনুষ্ঠান করা হলেও তাঁদের লক্ষ্য আগামী দিনে মসজিদের ভেতরে পূজা করা।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ে। কারণ, আদিনা মসজিদ ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সংরক্ষিত জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভে নতুন করে কোনও ধর্মীয় আচার শুরু করার অনুমতি নেই। এএসআইও সেই অবস্থানই স্পষ্ট করেছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই বিতর্কের রেশ পৌঁছেছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, আদিনা মসজিদ একটি প্রাচীন শিবমন্দিরের ওপর নির্মিত। অন্যদিকে হিন্দু সুরক্ষা সমিতির কিছু নেতা নিজেদের আরএসএসের আদর্শের অনুসারী বলে উল্লেখ করলেও, কর্মসূচির সঙ্গে বিজেপির আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই বলেই জানিয়েছে প্রশাসন।

কিন্তু ইতিহাস কী বলছে?
বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা ইতিহাসবিদদের মতে, “আদিনা” শব্দটির উৎস ফারসি ভাষা। এর অর্থ “শুক্রবার”। সেই অর্থে “আদিনা মসজিদ” বলতে বোঝায় জুমার নামাজের জন্য নির্মিত জামা মসজিদ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৩৬৯ সালে বাংলার সুলতান সিকন্দর শাহ এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সে সময় এটি ছিল উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। বিশাল আয়তনের এই স্থাপনায় শত শত গম্বুজ ও স্তম্ভ ছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক ভূমিকম্পে এর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আজও এর স্থাপত্য বাংলার মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
আদিনা মসজিদের স্থাপত্য নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে। ইসলামী স্থাপত্যরীতির পাশাপাশি এখানে বাংলার স্থানীয় শিল্পধারার প্রভাব স্পষ্ট। পদ্মফুল, লতাপাতা, অলংকরণ এবং কিছু পুনর্ব্যবহৃত পাথরে হিন্দু দেবদেবীর খোদাইও দেখা যায়। এই অংশগুলিকেই সামনে রেখে মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির দাবি তোলা হচ্ছে।

তবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, মধ্যযুগে পুরনো স্থাপনার পাথর বা নির্মাণসামগ্রী নতুন স্থাপত্যে ব্যবহার করা ছিল খুবই সাধারণ রীতি, যাকে ‘স্পোলিয়া’ বলা হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের বহু স্থাপত্যেই এর উদাহরণ রয়েছে। তাই শুধু পুনর্ব্যবহৃত পাথরে হিন্দু প্রতীক থাকলেই কোনও স্থাপনা মন্দির ভেঙে তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ইতিহাসে এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, সমসাময়িক শিলালিপি, নথি এবং বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার প্রয়োজন হয়।
এদিকে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলায় আদিনা মসজিদের ভেতরে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এবং পূজার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। এর মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে মসজিদের ভেতরে পূজা হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পরে মালদা জেলা পুলিশ স্পষ্ট জানায়, সংরক্ষিত অংশে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়নি এবং ভাইরাল হওয়া দাবিগুলি ভিত্তিহীন।

এই বিতর্কের মধ্যেই ইতিহাসবিদদের একাংশ আরেকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তাঁদের মতে, বাংলার বহু প্রাচীন মন্দির, বৌদ্ধ নিদর্শন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা আজও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে। সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে ততটা আলোচনা না হলেও, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলিকে ঘিরে বিতর্ক বারবার সামনে আসছে। ফলে ইতিহাসের প্রশ্নের সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
আদিনা মসজিদকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক তাই শুধুমাত্র একটি স্থাপত্যকে ঘিরে নয়। এটি ইতিহাসের ব্যাখ্যা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, আইনের সীমারেখা এবং সমকালীন রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিষয়। আদালতের রায় ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করবে ঠিকই, তবে ইতিহাসের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত গবেষণা, প্রমাণ এবং তথ্যের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। কারণ, শতাব্দী পেরিয়ে টিকে থাকা এমন ঐতিহ্য কেবল একটি ধর্মের নয়, বাংলার সামগ্রিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ।

