‘একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে
সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।’
নবারুণের কল্পিত মৃত্যু উপত্যকা আজ বাস্তব। এই তিলোত্তমা মৃত্যুশয্যায়, আর তাই যেন শহরের অলিগলিতে বিষবাষ্প। চিন্তন-মননে ধর্ম-ধর্ম খেলা। এর মাঝেও চারাগাছে জল দেন পাড়ার ললিতা কাকিমা। সাতসকালে কোরআন তেলাওয়াতের মতো সন্ধ্যায় শোনা যায় গীতাপাঠের সুর। ভক্তি ও ভালোবাসার মেলবন্ধনে তাল কেটে দেয় যারা, তারা সিংহাসনে। হাতে হাত দেখলেই চোখ রাঙায় যারা, তারা আজ পাড়ার মোড়ে মোড়ে। আচ্ছা, যখন ‘তারা’ ছিলেন না, তখনকার গপ্পো বলি একটা? শুনবেন?
সালটা ধরুন ১৯৮০। পাড়ার গলি, শেষ হচ্ছে মোড়ে। সরু রাস্তায় জমাটি ক্রিকেট ম্যাচ। নবীনের ঝোড়ো বাউন্সার ধেয়ে আসছে, রহিম জানে এটা পুল করলে সোজা ধৃতিমানদের বাড়ির শেষ বেঁচে থাকা কাচটাকেও চুরমার করবে! তা হোক, মেরেই দিই—ভেবে ব্যাট ঘোরাতে গিয়েই চোখ আটকে গেল। এক্কেবারে জন্টি রোডসের হাতে যেভাবে উড়ন্ত বল আটকে যায়, ওইভাবেই রহিমের চোখ আটকে গেল খোলা চুলে। ছোট্ট স্কার্ট। স্কুল ড্রেস। পিঠে ব্যাগ। আজ বিনুনি নেই, তাই আলাদা করে এই প্রথম শ্রেয়াকে চোখে পড়ল। চোখ গোল গোল করে রহিম দেখল। সময় থমকে গেলেও বল দাঁড়াল না, সোজা এসে উড়িয়ে দিল পুঁতে রাখা দুটো লাঠি! ‘আআআআআআউট’ চেঁচিয়ে উঠল নবীন। রহিম বলল, ‘সত্যিই আমি আউট…’
কাট টু ২০২৬। আধুনিক কলকাতায় ব্যস্ততার ছাপ সর্বত্র। গলিতে ক্রিকেট নেই। পাড়ার রোয়াকে আড্ডা আছে। হাতে আছে সিগারেট। ফোনে চটুল গান। সুন্দরী মহিলাদের দেখে সিটি মারা, কেউ কিছু বললেই উড়ে আসে অমোঘ প্রশ্ন—তুই জানিস আমি কে?
এমনই এক শহরে ধপাস করেই প্রেমে পড়ে রহিম আর শ্রেয়া। ময়দানের সবুজ ঘাসে হাতে হাত রাখতে গিয়েই বিপাকে। কালো মেঘের দল ছুটে আসে চোখ রাঙিয়ে। মেঘের কপালে গেরুয়া টিকা, হাতে তাদের বজ্রসমান অস্ত্র। ‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়/সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়…’ এ পংক্তির অর্থ অনুধাবনের আগেই উৎখাত হয় এমন শত শত কুঁড়ি। ধর্মের পঙ্কিল স্রোতে ভেসে যায় কত নরনারী। হারাম-হালাল দ্বন্দ্বে কুরবান হয়ে যায় অনুভূতি।

‘আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত রাত্রিটিরে ভালো,
খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার:
পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ; অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!’
জীবনানন্দের পংক্তিতে যা স্পষ্ট ভোরের শিশিরবিন্দুর মতো, তা আদতে বড় অস্পষ্ট ওদের কাছে। আমরা-ওরার রাজনীতিতে হারিয়ে গিয়েছে নিস্তব্ধতা। চুপ করে ‘শব্দহীন’ হওয়ার সুরে যারা গা ভাসাত, যাদের বিকেলের খেলা শেষ হত সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনিতে আর ঘুম ভাঙত ভোরের আজানে, তেমন একটা গোটা জেনারেশন আজ উধাও। ভালোবাসার স্বাধীনতা আদপে একটা ইউটোপিয়ান ভাবনা—মনে করছে ফুটপাথে বসে পা দোলানো বিশেষজ্ঞরা। ‘পুরোনো পেঁচার ঘ্রাণ’ যে অন্ধকারে হারানোর কথা বলছেন জীবনানন্দ, সেই আঁধার আসলে আমার-আপনার মনে। ধোঁয়া কেটে যাবে, চোখ জ্বালা করবে না আর—এইটুকু আশা ছাড়া আর কিই বা করতে পারি বলুন তো!
—–সার্কুলার—–
কাকে ভালোবাসবেন, কখন ভালোবাসবেন, কীভাবে ভালোবাসবেন—রোস্টার বানিয়ে রাখুন। পাঠিয়ে দিন রাষ্ট্রের ইমেইলে। পড়ে নেবেন আধিকারিকরা, কর্মকর্তারা। আদেশ দেবেন তারপর। কোথায় হাত রাখবেন, ঠোঁটে চুমু খাবেন ঘড়ি ধরে কতক্ষণ? আদেশনামায় উল্লিখিত হবে সবটা।
ভয় লাগে? ভয় লাগছে। গাছের পাতায় মৃদু দোলা লাগলে মনে হয় ওরা আপনাকে বলছে—ভয় নেই খোকা, ভয় নেই। তবে বর্তমানে আপনাকে মাথায় রাখতেই হবে, নবীনের বলে যেভাবে আউট হল রহিম, একইভাবে ভরসাও আউট। দ্রুতগতির উইকেট উপড়ানো বলের মতো ঢুকে এসেছে ভয়। হয়তো সাতসকালে হেঁটে যাচ্ছেন গলফগ্রিনের রাস্তায়। শুনতে পেলেন, সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয়েছে প্রতিবেদন, উচ্চৈঃস্বরে পড়ছেন সুনীল কাকু: মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানিয়েছেন, “ভরসা রাখবেন, একটু সময় দেবেন। ল্যান্ড জিহাদ, লাভ জিহাদ, আর বলপূর্বক ধর্মপরিবর্তন করার বিরুদ্ধে, অর্থাৎ ধর্মান্তকরণের বিরুদ্ধে কঠোর এবং কঠিন আইন এই সরকার আনবে।”
চমকে উঠবেন। মৌলিক অধিকার যে এখন ধর্মীয় রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যৌগিক অধিকারে রূপান্তরিত, তা মাথায় রাখতে হবে। ডেমোক্রেসির ডিম ফেটে গলে গলে পড়ছে ‘কুসুম’! দ্বিতীয় বিয়ে করছেন? ডেট করছেন? ফাঁকা ফ্ল্যাটে বসে আড্ডা দিচ্ছেন? সেকি! জানিয়ে আসুন থানায়। জানিয়ে রাখুন কার্যকর্তাদের। ভালোবাসার অধিকার? My foot!
বিভেদের প্রাচীর যখন আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে, মনে পড়বে ছোটবেলার কথা। মনে পড়বে শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি। তখন কে ভেবেছিল বলুন তো এইসব? দুপুরে একই থালায় পাত পেড়ে খাওয়া দুইজনের হঠাৎ মনে পড়ছে তাদের ধর্ম আলাদা, মজহব ভিন্ন। শ্লোক থেকে সুরা হয়ে যে রাস্তাটা পাড়ার মোড়ে মিশছে, ওখানেই দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট শিশু। চোখে তার খিদে, ভালোবাসার খিদে। হাতের বাটিতে সে চায় অধিকার, একটু ভালোবাসার অধিকার। স্বাধীনতা তার আছে। সে স্বাধীনতা দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভরা। ‘হেথা নাইকো মৃত্যু, নাইকো জ্বরা’র দেশে ওই শিশু মূর্তিমান এক ভারতবর্ষ। তার চোখে চোখ রাখতে গেলে উলঙ্গ হয়ে যেতে হবে। নিজের পাপপুণ্যের হিসাব ভরা তসবি আর পুরাণের লোকগাথাকে সত্যি বলে মেনে নেওয়া মনকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দাঁড়াতে হবে নির্লজ্জের মতো! পারবেন?

