বাংলা কবিতার বাঁক বদলে দাঁড়িয়ে সুনীল

১১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

প্রবহমান বাংলা কবিতার ধারায় রবীন্দ্রনাথ থেকে উৎপল কুমার বসু প্রত্যেকের নিজস্ব চিন্তা, কবিতা সম্পর্কে তাঁদের বিস্তারিত আলোচনা পর্যালোচনা এবং দীর্ঘ ধারণা – যা বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা কবিতার কথা বলতে গেলেই সবার আগেই আমাদের রবীন্দ্রনাথ দিয়ে শুরু করতে হয়, আবার সেই শেষ করতে হয় রবীন্দ্রনাথ দিয়ে। তাহলে এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নির্যাস যা পাওয়া যায়, তা শুনলে মনে হবে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথই কবিতার নির্মাণ, গঠন, ব্যাখ্যা থেকে সংজ্ঞা দিয়েছেন। যা রবীন্দ্রসমসাময়িক অথবা রবীন্দ্র পরবর্তী কোন কবিই দিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু ঘটনাটা ঠিক তেমন নয়। মানুষের জীবন থেকে ভাষা আর সমাজ থেকে সময় যেমন পরিবর্তনশীল, আমার মনে হয় কবিতা একটি শিল্প। এবং উৎকৃষ্ট শিল্প। আর এই শিল্প সমাজ থেকে জাত। তাই সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎকৃষ্ট শিল্প কবিতার পরিবর্তন কালের স্বাভাবিক নিয়ম। এই নিয়ম মেনে বাংলা কবিতার হাজার বছর চলার পথে যখনই শিল্পী অথবা কবি এসেছেন, তখনই তিনি তাঁর চিন্তা ভাবনায় এমন কি আত্মিকবোধের মধ্যে দিয়ে কবিতাকে পরীক্ষা করেছেন, পর্যালোচনা করেছেন, নতুন রূপ দিয়েছেন। এই নতুন রূপ দিতে গিয়ে বাংলা কবিতার যাত্রাপথে বাঁক বদল হয়েছে অনিবার্যভাবে। এবং কালের নিয়ম মেনেই। যেভাবে রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব সাহিত্যে কবিতার সর্বোচ্চ মার্গের পথ তৈরি করেছেন। আর বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের পরেও বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ প্রমূখ ব্যক্তিত্বরা প্রকৃত উত্তরসূরী হিসেবে কবিতার এই ধারাবাহিক প্রবাহকে তরঙ্গায়িত করেছেন।


বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মূলত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা কবিতাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন নিজের মুন্সিয়ানায়। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজগুলির মধ্যে কৃত্তিবাস পত্রিকার সম্পাদনা বাংলা কবিতার বাঁক বদলের ইতিহাস রচনা করেছে যেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে কবিতা ঠিক কিভাবে ধরা দিয়েছে, একটি সাক্ষাৎকার এ প্রসঙ্গে প্রথমেই তুলে আনি –
” প্রশ্ন: আপনার মতে কবিতার সংজ্ঞা কি হওয়া উচিত?
সুনীল: কবিতার কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। সে সংজ্ঞা উড়ে গেছে। এখন হচ্ছে যে কবিতা একটা শিল্পরীতি যেমন গদ্য একটা, যেমন নাটক একটা, যেমন গান একটা, সেরকমই। এবং আগে যেমন কবিতার ছন্দ, মিল, উপমা এই সমস্ত নিয়ে একটা বাড়াবাড়ি হত, এখন বলা হচ্ছে ওই সমস্ত কিছু না, সোজাসুজি জীবনের কথা বলতে হবে। সেজন্য অনেকেই এখন কবিতায় মিল দেয় না। অন্ত্যমিল তো উঠেই গেছে। ছন্দটাও অনেকে তুলে দিচ্ছে, অন্য ভাষায় তা অনেক সময় ছন্দ নেই। বাংলা কবিতার একটা বৈশিষ্ট্য আছে, বাংলা কবিতা একটুখানি গীতিধর্মী বলে, লিরিকধর্মী বলে, বাংলা কবিতায় ছন্দটা এড়ানো যায় না। এখনও অনেকেই ছন্দে লেখে।”


এই প্রসঙ্গেই আরও একটি লেখা যদি এর পরের প্যারায় যুক্ত করি তাহলে খুব সহজেই বুঝতে পারা যাবে ব্যক্তিগতভাবে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা সম্পর্কে ধারণা ও চিন্তা। কৃত্তিবাস পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। এই পত্রিকার ভূমিকায় ত্রয়ী সম্পাদকদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন – “…সকলের লেখার অধিকার থাকলেও আস্তে আস্তে একটি গোষ্ঠীও গড়ে ওঠে এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। একটা নতুন কাব্যধারা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদেশি ধাঁচে একটা কোনো বিশেষ নাম দিয়ে কাব্য আন্দোলন আমরা শুরু করিনি, কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কবিরা নিজেদের মধ্যে কোনোরকম পরামর্শ না করেই নতুন রীতিতে কবিতা লিখতে শুরু করে, তাকে বলা যেতে পারে স্বীকারোক্তিমূলক কবিতা।

এই কবিতা শুধু সৌন্দর্যের নির্মাণ নয়, রূপকল্পের সন্ধান নয়, এইসব কবিতা যেন তাদের রচয়িতাদের জীবনযাপনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুচণ্ডালিকে এতকাল দোষ বলে গণ্য করা হত, কৃত্তিবাসের কবিদের মতে গুরুচণ্ডালিই সঠিক আধুনিক কবিতার ভাষা। ছন্দের ঝোঁক দেখা গেল অনেকটা মুখের ভাষার কাছাকাছি।” অর্থাৎ এখান থেকেই যেন বাংলা কবিতা নিজের গঠন, বিন্যাস আর প্রয়োগ পরিবর্তন করতে পারছে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর হাত ধরে। এ যেন রোমান্টিক কবিতাকে বর্জন করে, আধুনিক কবিতাকে অর্জন করার প্রয়াস। এমনকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা কবিতার বৈশিষ্ট্য কিছুটা পরিবর্তন করলেন। ব্যক্তিগত কবিতা চর্চায় তিনি জীবনানন্দীয় উত্থানের যুগে সামান্য জীবনানন্দীয় ধাঁচ নিয়েছিলেন। কিন্তু বক্তব্যে তিনি ভিন্নধর্মিতা বজায় রেখেছিলেন। আর নিজস্ব মৌলিক স্বাচ্ছন্দ ভঙ্গিমা ভাষা ও ভাবনার ক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে তিনি নিজের কবিতার মধ্যে ব্যবহার করেছেন। তার ফলেই বাংলা কবিতা কোথাও যেন নতুন বাঁকে একরকম পথ হাঁটা শুরু করেছিল।

পাশ্চাত্যের ফরাসি কবিতার ক্ষেত্রে শার্ল বোদলেয়ার, ইংরেজি কবিতার ক্ষেত্রে এজরা পাউন্ড, বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু যেমন নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের একমাত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই নেতৃত্বের ভূমিকা অনেকটা পালন করেছিলেন। তাই কবিতা সম্পর্কে বারবার তিনি তাঁর সুচিন্তিত ধারণা, মতামত একইভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। কৃত্তিবাস, সম্পাদকীয়তে প্রথম সংকলন শ্রাবণ, ১৩৬০ – এ তিনি লিখছেন, কৃত্তিবাস প্রথম সংখ্যায় স্বয়ং তিনি যে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন – “কৃত্তিবাস বাংলাদেশের তরুণতম কবিদের মুখপত্র। একেবারে তরুণদের সার্থক না হলেও ভালো নতুন কবিতার গতিপথের একটা নিরিখ যাতে পাওয়া যায় সেই উদ্দেশ্যে তাঁদের কবিতা এতে একত্র করা হবে। … বিভিন্ন তরুণদের বিক্ষিপ্ত কাব্যপ্রচেষ্টাকে সংহত করলে-বাংলা কবিতায় প্রাণছন্দের উত্তাপ নতুন আবেগে এবং বলিষ্ঠতায় লাগতে পারে এবং সকলের মধ্যে প্রত্যেকের কণ্ঠস্বরকেই আলাদা করে চেনা যেতে পারে।”

মূলত খুব সহজ নেতৃত্বের কারণেই তিনি কবিতার নির্জন আত্মগত উচ্চারণের রাজ্যেও এক অপূর্ব আত্মবিশ্বাস ও ভাষার স্বাচ্ছন্দ নিয়ে কবিতার যাত্রা শুরু করেছিলেন। যার জন্যই তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন আধুনিক কবিতার নির্মাতা। আর এই নির্মান কাজে সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলেন ইমাজিস্ট মুভমেন্ট এর কবিদের। যাঁরা হলেন, এজরা পাউন্ড, হিল্ডা ডুলিটল, এমি লোয়েল, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস প্রভৃতি কবিরা চিত্রকল্পবাদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, অবশ্য এজরা পাউন্ডই ছিলেন কেন্দ্রীয় শক্তি বা প্রধান চরিত্র। Some Imagist Poets নামক যে কাব্যসংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল, তার ১৯১৫ সালের সংস্করণে এই নতুন কাব্য আন্দোলনের মূল সূত্রগুলি বলা হয়েছে। “To use the language of the common speech’, ‘To create new rhythms-as the expression of news moods.’ ‘To allow absolute freedom in the choice of subject,’ ‘To present an image.” – এই ধরনের কথাবার্তা বলেছিলেন এই ইমেজিস্ট পোয়েটরা। আর এইখানেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন প্রবহমান বাংলা কবিতার ধারায় নিজের সাবেকী নৌকার হাল। এই প্রসঙ্গে একটি কবিতার পঙক্তি তুলে আনি –
‘ একজন যুবক শুধু দূর থেকে হেঁটে এসে ক্লান্ত রুক্ষ দেহে/ সিগারেট ঠোঁটে চেপে শব্দ করে বারুদ পোড়ালো/ সম্বল সামান্য মুদ্রা করতলে গুনে গুনে দেখলো সস্নেহে/এ মাসেই চাকরি হবে, হেসে উঠলো, চোখে পড়লো/অলিন্দের আলো।
এর চেয়ে রাত্রি ভালো, নির্লিপ্তের মতো চেয়ে বললো মনে মনে/কিছুদূর হেঁটে গিয়ে শেষবার ফিরে দেখলো তাকে/রোদ্দুর লেগেছে তার ঢেকে রাখা যৌবনের প্রতি কোণে কোণে/এ যেন নদীর মতো, নতুন দৃশ্যের শোভা প্রতি বাঁকে বাঁকে/
এর চেয়ে রাত্রি ভালো, যুবকটি মনে মনে বললো বারবার/রোদ্দুর মহৎ করে মন, আমি চাই শুধু ক্লান্ত অন্ধকার।(দুপুর: একা এবং কয়েকজন)


এই কবিতা থেকেই খুব সহজে এটুকু অনুমান করা যায় যে তরুণ কবি নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে নেওয়ার চেষ্টায় সর্বদাই ব্যস্ত। সর্বদাই সেই তরুণ কবি খুঁজে চলেছেন নিজের ভাষা। ভাব আর ভাবনা। কবিতার মধ্যে আছে আবেগ, আছে অনুভূতি, বাস্তববাদী যুক্তি; যা থেকেই কবিতাগুলো হয়ে ওঠে জীবন্ত অভিজ্ঞতার ফসল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পড়লে প্রথমে বুঝতে পারা যায় অগ্রজ কবির সঙ্গে তাঁর সাহিত্যগত যোগাযোগ। পড়তে পড়তে মনে হয় কাছের কবি বুদ্ধদেব বসু অথবা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। আর কখনো জীবনানন্দ দাশকে তাঁর কবিতায় একটু আধটু বসিয়ে নিয়েছেন সন্তর্পনে।

অন্যদিকে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ কবি অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর কবিতার দূরত্ব কোথাও যেন রয়েই গেছে। কিন্তু তবুও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আলোচনা প্রসঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর আলোচনা আসবে না তা হতেই পারে না। অথচ অমিয় চক্রবর্তী ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভৌগোলিকগত অবস্থান কতটা দূর। কিন্তু তবুও যেন এই দূর, দূর বলেই মনে হয় না যখন আমরা খুব সাধারণ একটি উপমার কথা তুলে আনি। ব্রিটিশ জোব চার্ণক এর সঙ্গে আমাদের কল্লোলিনী তিলোত্তমা কলকাতার যে সম্পর্ক। সহজ সরল ভাবের বক্তব্যকে ভাষায় বর্ণনার যে অবর্ণনীয় কাজ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর সারা জীবন কবিতা চর্চায় করেছেন তা অতি বিরল। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই যৌবনের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন Art for Arts’ sake.” অর্থাৎ কলা কৈবল্যবাদের প্রবক্তা অস্কার ওয়াইল্ডের বইটি থেকে। আবার ঠিক এই সময়েই তিনি বুদ্ধদেব বসুর গুণমুগ্ধ পাঠক হয়ে ওঠেন। নিজের কথাতেই তিনি যেন স্বীকার করেছেন বুদ্ধদেব বসুর পড়ে ফেলা রচনা সম্ভার থেকে। যেখানে কবিতার ভাষা অসহ্য সুন্দর অথচ ব্যক্তিগত কথা, স্বগতক্তি ও স্বীকারোক্তির মত যুগপৎ ভাবনা এবং আনন্দ ও বিষণ্ন আত্ম পুরুষের কাহিনী যেন তার কবিতার ঋজুতাকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এই কবিতা ব্যক্তিগত হয়েও পাঠকের হতে পেরেছে হতে পেরেছে বিশ্বের। যা লিরিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

অন্যান্য প্রতিবেদন.