যে শিশু ভূমিষ্ঠ হ’ল আজ রাতে, তার মুখ চিনে নিয়ে মন হয় ব্যথিত। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতাটি আমি ছোটবেলা থেকে বহুবার পড়েছি, কিন্তু প্রকৃত অর্থটা বুঝতে পারিনি। আজ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি এই পঙ্ক্তিগুলিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। পৃথিবীতে নবজন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর জ্ঞানের আত্মপ্রকাশ ঘটে বই পড়ার মাধ্যমে, জানার মাধ্যমে। ঠিক-ভুলের পার্থক্য চিনতে শেখায় বই, আর সেই ঠিক-ভুলের বোধ থেকেই প্রতিটি শিশুর মধ্যে গড়ে ওঠে বিবেক।
অথচ আজকের পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরছে আমরা কি এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে বইয়ের বিষয়বস্তুর চেয়েও বইটির রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? যেখানে মার্কস, লেনিন কিংবা ভগৎ সিংয়ের বই কোন চিন্তার কথা বলছে, তা নিয়ে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে সেই বইগুলিকেই রাস্তায় ছুড়ে ফেলার দৃশ্য দেখতে হয় যেখানে বই বিক্রির স্টল ভেঙে ফেলা হচ্ছে বুলডোজার দিয়ে সেখানে প্রশ্ন ওঠে বইয়ের সঙ্গে এই শত্রুতা কেন? জ্ঞানের সঙ্গে এই সংঘাত কেন?
বইয়ের সঙ্গে মতের বিরোধ থাকতে পারে, আদর্শের সঙ্গে আদর্শের সংঘাত থাকতে পারে। মার্কসের তত্ত্বের সমালোচনা হতে পারে, লেনিনের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, ভগৎ সিংয়ের চিন্তার ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের মীমাংসা হবে যুক্তিতে, লেখায়, আলোচনায় বুলডোজারের আঘাতে নয়। কোনও বইয়ের বক্তব্য ভুল মনে হলে তার জবাব লিখুন। কোনও মতাদর্শের বিরোধিতা করতে হলে যুক্তি সাজান। কিন্তু বইটিকেই যদি সহ্য করা না যায়, বই বিক্রির জায়গাটিকেই যদি নিশ্চিহ্ন করে দিতে হয়, তবে প্রশ্ন উঠবেই আসলে ভয়টা বইকে, না বই পড়ে জেগে ওঠা মানুষের বিবেককে?
ক্ষমতা মানুষের হাতে আসে শাসন করার জন্য, মানুষের কণ্ঠরোধ করার জন্য নয়; মতভেদকে মোকাবিলা করার জন্য, ভিন্নমতকে মুছে ফেলার জন্য নয়। যে ক্ষমতা প্রশ্নকে ভয় পায়, যে শাসন সমালোচনাকে শত্রু মনে করে, যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি যুক্তির পরিবর্তে বলপ্রয়োগকে বেছে নেয় তার সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন করা আরও জরুরি হয়ে ওঠে।বুলডোজার নির্ভর এই সরকার আমাদের দেখিয়ে দিল, কোনও রুচিশীল মানুষ, বিবেকসম্পন্ন মানুষ এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন না। এই সব কুরুচিকর সিদ্ধান্ত তাঁদের মাথা থেকেই বেরোয়, যাঁরা কোনও দিন বই পড়েননি এবং যাঁদের শিক্ষার সঙ্গে কোনও রকম সম্পর্ক নেই।
একনায়কতন্ত্রের প্রথম ধাপ হলো ভিন্নমত পোষণকারীদের গোড়া থেকে নির্মূল করা। তার জন্য যদি বইয়ের স্টল বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হয়, তবে সেটাই উপযুক্ত পথ! যাঁরা বইয়ের স্টল ভাঙতে পারেন, তাঁরা শিক্ষার কী দাম দেবেন? তাঁদের কাছে মেধার সংজ্ঞা কী? পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের তা বুঝতে হবে, তা জানতে হবে।
তাঁরা ভিন্নমত পোষণকারী হতে পারেন, তাঁদের চিন্তা করতে হবে। বইয়ের বিরুদ্ধে তর্ক হয় বই দিয়ে, বুলডোজার দিয়ে নয়। একটা বইয়ের জবাব দিতে গিয়ে হাত চালাতে হচ্ছে কেন? এ আবার কেমন আদর্শ?
শুরু থেকেই বিষয়টা আদর্শ বনাম আদর্শ ছিল না বিষয়টি ছিল ফ্যাসিবাদ বনাম সাধারণ মানুষ। শিক্ষাকে যখন সরকারের অনুমোদন চাইতে হয়, তখন তার অন্তঃসার বলে আর কিছু থাকে না। তা হয়ে যায় স্ফুলিঙ্গহীন ভেজা বারুদ।
তাই “যে শিশু ভূমিষ্ঠ হ’ল আজ রাতে, তার মুখ চিনে নিয়ে মন হয় ব্যথিত।”

