Shopping cart

কলাম

‘নন্দ ঘোষ’ যুবরাজ, বিজেপির হাত ধরে বাঁচতে নেমেছে তৃণমূল

21

‘জুলফিকার’-এ গান ছিল একটি। নচিকেতা চক্রবর্তীর গাওয়া। তার কয়েকটি পংক্তি ছিল এমন—

‘..রাজার হলো খুব অসুখ,

জ্বললো বাড়ি ভাঙলো বুক

রাজার মুকুট রাজার সাজ

অন্য কেউ তা পরবে আজ।’’

মমতা ব্যানার্জি কোন দিক থেকেই ‘রাজা’ নন। অভিষেক ব্যানার্জিও ‘যুবরাজ’ নন। তবে দলের নেতা, বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী, সাংসদ এমনকি তাঁর পিসির বাড়ির গলির মুখের দোকানদারের মুখেও শুনেছি—‘বড় বাড় বেড়েছিল ছেলেটার। হাবভাব দেখলেই গা জ্বলতো।’

নানা অংশের মানুষের মন, বুক জ্বলেছে। তাই তৃণমূল কংগ্রেসের ঘরে আগুন লেগেছে। তবে ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’-এর নয়। তবে অভিযুক্ত সেই ‘নন্দ ঘোষ’-এর কাঁধে বন্দুক রেখেই নিজেদের আপাতত আড়াল করতে নেমেছেন তৃণমূলের নেতা, বিধায়কদের বড় অংশ। বল এখন মমতা ব্যানার্জির কোর্টে। অভিষেক ব্যানার্জিকে রক্ষা করার একটিই পথ তাঁর সামনে খোলা আছে। তা হলো বিক্ষুব্ধদের দাবি মেনে ঋতব্রত ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন পরিষদীয় দলকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

ঋতব্রত ব্যানার্জির সঙ্গে থাকা ৫৮ জন বিধায়কদের বড় অংশেরও সমস্যা বিরাট। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে নানা রকমের দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এলাকায় দলের কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, জেলা পরিষদ সদস্যদের একাংশ গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকের বাড়ি থেকে সরকারি সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে। এমন ‘চাপে’ থাকা অবস্থায় সেই বিধায়কদের কিছুটা ‘স্বস্তি’ প্রয়োজন। অঙ্ক সোজা। অভিষেক ব্যানার্জিকে নেতা মেনে চললে বিপদ বাড়বে বই কমবে না। ঋতব্রত ব্যানার্জি, সন্দীপন সাহাদের সঙ্গে থাকলে আপাতত বিপদ ঠেকিয়ে রাখার সম্ভাবনা আছে। কারন— ঋতব্রত, সন্দীপনের সঙ্গে বিজেপি’র সম্পর্ক তুলনামূলক ভাল। তৃণমূল কংগ্রেসেরও নেতা, কর্মীদের বড় অংশ এখন এলাকায় মানুষের বিক্ষোভ, পুলিশি হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে চাইছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জি বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণই জানাতেন না। এখন তাঁরই অনুমতি নিয়ে ফিরহাদ হাকিম, কুণাল ঘোষরা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠকে হাজির হচ্ছেন।

এরই মাঝে, গত ২ জুন ধর্মতলায় মমতা ব্যানার্জির ডাকা সভায় তৃণমূল কর্মীরা বিশেষ সাড়া দেননি। এসেছিলেন খুবই অল্প, হাজার খানেক কর্মী। তাও কলকাতার নানা জায়গা থেকে বিক্ষিপ্তভাবে। লাগোয়া হুগলী, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের দেখা যায়নি সেই সভায়। মাত্র একমাস আগে, গত ৪ মে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস হেরেছে। বিজেপি জিতেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী শপথ নিয়েছেন ৯ মে। তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করছে বিরোধী দলনেতা ঠিক করতে তাদের বিধায়করা বৈঠক করেছেন ৬ মে! এত তাড়াহুড়ো কেন ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের? বিধানসভার অধ্যক্ষ নির্বাচন হয়েছে ১৫ মে। অধ্যক্ষের পদ প্রার্থী হিসাবে রথীন্দ্রনাথ বসুর নাম বিজেপি ঘোষনা করেছে ১৪ মে। তাহলে এত আগে বিধানসভায় পরিষদীয় দলের নেতা বাছতে বসেছিল কেন তৃণমূল কংগ্রেস? নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের কাজকর্মের ক্রনোলজি দেখলেই একটি সন্দেহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। অধ্যক্ষ নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে অভিষেক ব্যানার্জির সই করা চিঠি দেওয়া হলো ১৭ মে। সেই চিঠিতে দলের বিধায়কদের সই লাগবে দাবি করে অধ্যক্ষ ফের চিঠি দিতে বললেন। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সেই চিঠির সঙ্গে তাদের দলের মিনিটস কপির জেরক্স জুড়ে পাঠানো হলো ২০ মে। ২১ মে ‘পাসপোর্টের কাজে’ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নয়াদিল্লি গেলেন। ২২ মে দুপুরে বঙ্গভবনে তাঁর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘আচমকা দেখা হয়ে গেল’। ২৭ মে বিধানসভায় গিয়ে অধ্যক্ষর সঙ্গে দেখা করলেন ঋতব্রত এবং এন্টালির তৃণমূল বিধায়ক সন্দীপন সাহা। তাঁরা অভিযোগ জানিয়ে অধ্যক্ষকে চিঠি দিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে অধ্যক্ষ বিধানসভার সচিবকে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে নির্দেশ দিলেন। সচিব হেয়ার স্ট্রীট থানায় এফআইআর করলেন। অভিযোগ— জালিয়াতির। তার দু’দিন পর, যেদিন সিআইডি তাঁর বাড়িতে শমন নিয়ে গেছিল, সেদিনই অভিষেক ব্যানার্জি সোনাপুরে গিয়েছিলেন। নিগৃহীত হয়েছিলেন। এবং আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর দলের কর্মীরা তাঁর জন্য দুটি ক্রিকেট খেলার হেলমেট মজুত রেখেছিল।

তারপর থেকে অভিষেক ‘অসুস্থ’। কী ছিল ঋতব্রতদের অভিযোগ? অভিষেক ব্যানার্জির সই করা চিঠির সঙ্গে যে মিনিটস কপি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, তাতে ৭০জন বিধায়কের সই ছিল। ঋতব্রত, সন্দীপন সাহাদের অভিযোগ, তাতে অনেকের সই জাল করা হয়েছে। চিঠিতে ১৬ জনের নাম ইংরাজি ব্লক লেটারে লেখা ছিল। মূলত অভিযোগ সেই নামগুলি নিয়েই। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সেই ব্লক লেটারে লেখা নামের নিচে মাত্র ৪ জন নিজেদের সই বা ইনিশিয়াল করে রেখেছিলেন। তাঁরা হলেন কুণাল ঘোষ, ঋতব্রত ব্যানার্জি, সন্দীপন সাহা এবং দীনেন রায়। কেন এই চারজনের মনে হয়েছিল যে, ব্লক লেটারে লেখা নামের নিচে নিজেদের সই রেখে দেওয়া দরকার, তা এই ঘটনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই চারজনের মধ্যে তিনজন এখন আছেন ‘বিক্ষুব্ধ’, বিদ্রোহী’ তৃণমূলে। আর কুনাল ঘোষ আছেন মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে।রহস্য আরও আছে। আগামী ৮ জুন মমতা ব্যানার্জির নয়াদিল্লি যাওয়ার কথা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিতে। আগামী ১৫ জুন অভিষেক ব্যানার্জিকে এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি) ডেকে পাঠিয়েছে জেরার জন্য। কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে শিক্ষক নিয়োগের তদন্তে তাঁকে জেরা করতে চায় ইডি। আর তার দু’দিন পর, আগামী ১৮ জুন শুরু হবে বিধানসভার বাজেট অধিবেসন। বিরোধী দলের নেতা হিসাবে ইতিমধ্যেই অধ্যক্ষ, ঋতব্রত ব্যানার্জির নামে অনুমোদন দিয়েছেন। কারন, তৃণমূল কংগ্রেসের ৫৮ জন বিধায়ক তাঁদের সমর্থন জানিয়েছেন ঋতব্রতর পক্ষে। ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যদি তৃণমূল কংগ্রেসের ৫৮ জন বিধায়ক তাঁদের সমর্থন না করতেন, তাহলে ওই দু’জনকে ‘নির্দল’ হিসাবে বিধানসভায় বসতে হতো। এখন ৫৮ জনের (দুই-তৃতীয়াংশ) সমর্থন করায় তাঁদের ‘নির্দল’ হওয়ার আশঙ্কা নেই। পাশাপাশি দলের বিধায়কদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন থাকায় এই ৫৯ জন দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতাতেও পড়ছেন না। অর্থাৎ এই ‘বিক্ষুব্ধ’রাই বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেস। দুটি তৃণমূল কংগ্রেস সেক্ষেত্রে হাজির হলো— পরিষদীয় তৃণমূল কংগ্রেস এবং কালীঘাটের তৃণমূল কংগ্রেস। অবস্থা বুঝে দলের সব কমিটি মমতা ব্যানার্জি ভেঙে দিয়েছেন। অর্থাৎ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও কাঠামোই আর নেই। আছে শুধু পরিষদীয় দল। এই ‘পরিষদীয় তৃণমূল কংগ্রেস’-এ মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রীসভার ৯ জন মন্ত্রী আছেন, যাঁরা ২০২৬-এর নির্বাচনে জিতে এসেছেন। বিক্ষুব্ধরা কিন্তু মমতা ব্যানার্জিকে ‘পরামর্শদাতা’ হিসাবে উল্লেখ করেই অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসুকে চিঠি দিয়েছেন। তাঁরা বিধানসভার বাইরেও দাবি করেছেন,‘‘আমরা মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে আছি। তিনিই আমাদের নেত্রী।’’ প্রশ্ন হলো মমতা ব্যানার্জি কী করবেন? বিক্ষোভের মূল কারন ‘অভিষেক ব্যানার্জি।’ বিক্ষুব্ধরা সবাই তাই বলছেন। অভিষেক এবং আই প্যাকের ঔদ্ধত্য তাঁদের বিক্ষুব্ধ করেছে। দল বাঁচাতে তাঁকে ঋতব্রত সহ ওই ৫৯ জনের বিদ্রোহের সামনে মাথা নত করতে হবে। তাঁকে এই পরিষদীয় দল মেনে নিতে হবে। তাতে লাভ বিজেপির। শাসক দল তারা। বিরোধী দলও তাদের কথায় চলবে। অন্তত ২০২৯ পর্যন্ত তারা এই ভাবেই চলতে চাইছে। ২০২৯-এ লোকসভা নির্বাচন।

সম্পর্কিত খবর