কিছুদিন থেকেই ফুটপাতের সীতা ওরফে রশিদাকে নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে বঙ্গ রাজনীতি। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, পার্ক স্ট্রিটের আভিজাত রাস্তা থেকে চিহ্নিত করেন এক মহিলাকে যিনি তার বাচ্চাদের জন্যে দুধ গরম করছিলেন। সেই থেকে তাঁকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ঘটনার পরই সীতার পক্ষ নিয়ে সরব হন, পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ। এরপরেই উক্ত মন্ত্রী বলেন, উনি ফুটপাথবাসী মানুষদের বিরোধী নন এবং পথ চলতি মানুষের বিপদ যাতে না হয় তার জন্যেই ওই আচরণ করেন।
মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্পাদিত জনতার দরবারে এসে উপস্থিত হন সীতা। মুখ্যমন্ত্রী নিজে তাঁর সাথে কথা বলেন এবং আশ্বাস দেন যে তার বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এই ঘটনার দুইদিন পরেই বেলেঘাটার এক আশ্রয়স্থলে দেখা মেলে রশিদার ছোট মেয়ের। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানান, সীতা এবং তাঁর বড় মেয়েকে শেল্টার হোমের সামনে নিয়ে আসা হলেও তাঁরা কিছুতেই থাকতে চাননি এবং গাড়ি থেকেও নামেননি। ছোট মেয়েও ফিরে যেতে চান মায়ের কাছেই। ২৬ শে আগস্ট, আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে, বিধায়ক সজল মুখার্জি জানান, সীতা এবং তাঁর বড় মেয়ে দলের এক কর্মীর দায়িত্বে রয়েছেন।
আজ জানা যাচ্ছে, সীতার পছন্দের ঘরের সন্ধান মিলেছে। শুধু তাই নয়, সঙ্গে এক হোটেলে সাফাইকর্মীর কাজও পেয়েছে ৬০ বছর বয়সী সেই মহিলা। কয়েকদিন ধরেই তার জন্যে নিজের পছন্দের ঘর খুঁজছিল কলকাতা পুরসভার। ততদিন সে এবং ছোট মেয়েকে হোটেলে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা হয়েছিল বলে জানাচ্ছে শাসকদল।
আজ সীতার ঘরের বন্দোবস্ত করে দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কিন্তু রামরাজ্যে কত সীতাই যে আজ গৃহহীন তার হিসেব নেই। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী কলকাতায় ফুটপাত – উড়ালপুলের নীচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৭০ হাজার। দেড় শতাংশেরও বেশি কলকাতাবাসী বসবাস করেন ফুটপাতে। ২০১৮ সালে করা এক সমীক্ষা অনুযায়ী ৭ হাজারেরও বেশি ফুটপাতবাসী গৃহহীন। আসলেই ঠিক কতজন গৃহহীন, তার কোনো সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নেই।
কলকাতায় গৃহহীনদের জন্যে শেল্টার হোমের শুরুয়াত করা হয় ২০১০ সাল থেকে। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের এক যোজনা অনুযায়ী কেন্দ্র সরকার ৬০% এবং রাজ্য সরকার ৪০% মদদ করে নিরাশ্রয়দের আবাস দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। যদিও এই আশ্রয়স্থানগুলোতে শুধু গৃহহীনরাই নয়, ঘর থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া মানুষেরাও আশ্রয় গ্রহন করে। প্রশ্ন উঠছে, এত ব্যবস্থাপনার পরেও কিভাবে কলকাতার মত বড় শহরের বুকে আজও মাত্র ১০ টি আশ্রয়স্থল? সম্প্রতি তেমনই এক আশ্রয়কেন্দ্র আনান্দবাজার’কে এক সাক্ষাৎকারে জানায় যে, তাদের সরকারি নিদান বন্ধ হয়ে আছে আজ প্রায় ১১ মাস। সেই আশ্রয়স্থানের বাসিন্দারা কালই ঘরছাড়া হয়ে যাবেনা তা কেই বা বলতে পারে!
অনেক মানুষেরাই মন্তব্য করে, গৃহহীনদের আশ্রয় দেওয়া সত্ত্বেও তারা নাকি ফিরে আসে ফুটপাতেই। আদতেই কি তাই? যাদের মাথার ওপর সামান্য ছাদটুকু নেই, তাঁদের বাচ্চার জন্যে গরম দুধের পরিমানই চোখে ঠেকছে অনেকের। আমরা কি ভুলে গেছি মানুষ হতে?

