বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়? সেক্যুলার নেতাজির আদর্শ নিয়ে সমস্যা BJP-র! তাই অনন্ত মহারাজ এখনও বাইরে?

বাংলার মাটি, অভিন্ন প্রাণের টান ও রবীন্দ্রনাথের রাখি: বিভেদের রাজনীতিতে সম্প্রীতির সেতুবন্ধ

২২ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​১৯০৫ সাল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কুটিল ও কূটাভাষী চক্রান্তে বাংলার আকাশ তখন বারুদাক্ত ও থমথমে। লর্ড কার্জনের প্রত্যক্ষ মদতে ঘোষিত হয়েছে ‘বঙ্গভঙ্গ’— যে পদক্ষেপের নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল ‘Divide and Rule’ নীতির নিখুঁত নীলনকশা। উদ্দেশ্য ছিল একটাই— উদীয়মান জাতীয়তাবাদী চেতনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা, বাঙালিকে ভাষা ও ধর্মের ভিত্তিতে চিরতরে খণ্ডিত করা। ব্রিটিশের এই কূটকৌশল যখন বাঙালি সমাজকে পঙ্গু করে দিতে উদ্যত, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দ্রষ্টার দৃষ্টি নিয়ে আবির্ভূত হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা সভার গতানুগতিক গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানলেন এক সুকুমার অথচ বজ্রকঠিন অস্ত্র দিয়ে— ‘রাখি বন্ধন’।

​রাখি মূলত ভাই ও বোনের সম্পর্কের প্রতীক হলেও, ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর (৩০শে আশ্বিন) রবীন্দ্রনাথ তাকে উন্নীত করলেন সর্বভারতীয় তথা সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের মহামন্ত্রে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা গোত্র নির্বিশেষে মানুষে মানুষে যে অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছিল ঔপনিবেশিক শক্তি, তাকে গুঁড়িয়ে দিতে সেদিন বাংলার রাজপথে নেমেছিল হাজারো মানুষ। হাতে হলুদ রঙের সুতো বেঁধে শপথ নিয়েছিল অখণ্ড বাংলার।

রাখি বন্ধন উৎসব


​ সাধারণ মানুষকে রাখি পরাতে পরাতে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সহযাত্রীরা এসে উপস্থিত হন ঐতিহাসিক নাখোদা মসজিদ প্রাঙ্গণে। মসজিদের ইমাম ও প্রবীণ মুসলিম ধর্মগুরুদের হাতে রাখি পরিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঘোষণা করেন অটুট সৌভ্রাতৃত্বের বাণী। সুতোর সেই সামান্য বন্ধন সেদিন প্রমাণ করেছিল যে, ধর্মের বেড়া জালের চেয়ে মানুষের হৃদয়ের টান অনেক বেশি শক্তিশালী।
​সেই মিছিলে আর সুরের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল বাংলার আকাশ বাতাস মাটি জল –
​”বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু ,বাংলার ফল পুণ্য হউক পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান…”



​আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন শিউরে উঠতে হয়। রাজনীতির আঙিনায় আজ ধর্মের ধ্বজা উড়িয়ে মেরুকরণের যে বিষবাষ্প ছড়ানো হচ্ছে, তা আমাদের বহুযুগ ধরে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহিষ্ণুতার ভিতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। তুচ্ছ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতি বিনষ্ট করা হচ্ছে, দেওয়াল তোলা হচ্ছে বিশ্বাসের ঘরে ঘরে।


​অথচ ভারতবর্ষের মূল সুরটি লুকিয়ে আছে ‘সর্বধর্মসমন্বয়’ ও বহুত্ববাদের মধ্যে। এখানে গঙ্গার জলের সঙ্গে মিশে আছে আজানের সুর। রবীন্দ্রনাথের বাংলা কখনোই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার খাঁচায় বন্দি হওয়ার জন্য জন্মায়নি। প্রতি বছরের রাখিবন্ধন উৎসব আমাদের কেবল একটি সাধারণ প্রথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের প্রকৃত শেকড় ও অন্তর্নিহিত চরিত্রকে।

​আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যখন অন্ধত্ব ও হিংসার উন্মাদনা চারপাশ গ্রাস করতে চায়, তখন আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। যে বাংলার মাটি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী উচ্চারণে এবং রবীন্দ্রনাথের গানে মুখরিত, সে বাংলায় ধর্মীয় বিভেদ ও ঘৃণার রাজনীতির কোনো ঠাঁই থাকতে পারে না।


আসুন না , বর্তমানের এই রাজনৈতিক অসত্য ও বিভাজনের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা আবার নতুন করে শপথ নিই। রবীন্দ্রনাথের সেই নাখোদা মসজিদের আঙিনা থেকে শুরু করে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে যে সম্প্রীতির বীজ রোপিত হয়েছিল, তাকে বটবৃক্ষে পরিণত করার দায়িত্ব আমাদেরই। ধর্মের ভিত্তিতে যারা বাংলাকে খণ্ডিত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে বাঙালির শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হোক মানবিকতা, একতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। আজ আরও একবার সোচ্চারে ঘোষিত হোক বাংলার আকাশ বাতাস মাটি জল সর্বত্র-
​“বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন— এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।”

অন্যান্য প্রতিবেদন.