দেনার দায়ে কিডনি বিক্রি, শেষমেশ পাচার!

১৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন


​ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতির আড়ালে রয়ে গেছে এক করুণ ও মর্মান্তিক বাস্তব চিত্র। তামিলনাড়ুর নামাক্কল জেলার পল্লিপালায়াম এবং কোমারাপালায়ন অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও ঋণের জাল গরিব মানুষকে তাদের দেহের অঙ্গ বিক্রি করতে বাধ্য করছে। পেট চালাতে এবং চড়া সুদে নেওয়া ঋণ শোধ করতে মানুষের কিডনি বিক্রির এই ভয়ংকর কাহিনি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি দেশের কাঠামোগত ব্যর্থতার দগদগে দৃষ্টান্ত ।
​
​নামাক্কল অঞ্চলের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই পাওয়ারলুম বা বিদ্যুৎচালিত তাঁত এবং টেক্সটাইল শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক নীতি, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং বাজারের মন্দার কারণে এখানকার বহু তাঁত আজ বন্ধ। কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়া শ্রমিকরা যখন তীব্র আর্থিক অনটনের মুখে পড়েন, তখন স্থানীয় মহাজন ও চক্রের দালালরা তাদের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে শ্রমিকরা নিজেদের শরীর বা অঙ্গ বিক্রির মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। নামাক্কলের অনেক পাড়ায় আজ কিডনি বিক্রেতা পাওয়া একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

নামাক্কলের প্রতিটি ঘরে অন্তত একজনের রয়েছে এই অস্ত্রপচারের ক্ষত

​তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই অবৈধ অঙ্গ ব্যবসার পেছনে রয়েছে এক শক্তিশালী দালাল চক্র। গরিব ও নিরক্ষর শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে বা লোভ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যার ছিটেফোঁটাও শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে পৌঁছায় না। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা অস্ত্রোপচারের পর প্রতিশ্রুত টাকা তো পানই না, উল্টো জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েন। একটি ওয়াটঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হত বলে জানান ভুক্তভোগীরা৷ রাতারাতি মহাজনের মাধ্যমে পাসপোর্টের ব্যবস্থা হয়৷ তারপর ব্রহ্মপুরী, ব্রহ্মপুরী থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে কম্বোডিয়া পাচার। এমনকি সিঙ্গাপুর পর্যন্ত পাচার হয়েছেন অনেকে গোপন অঙ্গদানের নামে। অন্যদিকে, বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল এবং প্রভাবশালী চক্র এই অসহায় মানুষের চরম দারিদ্র্যকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে।
​
​এই অঙ্গ পাচারের কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তীব্র ঝড় ওঠে। বিরোধী দলগুলো রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে এবং শাসক দলের সঙ্গে জড়িত কিছু নেতার নাম এই চক্রে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ তোলে। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী একে সুনির্দিষ্ট “অনিয়ম” হিসেবে উল্লেখ করে অঙ্গ চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবুও সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই দোষারোপের রাজনীতির বাইরে আসল সত্য হলো, প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব ।

​নামাক্কলের এই মর্মস্পর্শী চিত্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সামাজিক সুরক্ষা এবং সুষম উন্নয়ন ছাড়া কেবল আইন দিয়ে অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। দরিদ্র মানুষের পেটের জ্বালা ও ঋণগ্রস্ততাকে পুঁজি করে যে অনৈতিক ও অমানবিক বাজার গড়ে উঠেছে, তার মূলোৎপাটন করতে হলে প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল সংস্কার।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.