শহর জুড়ে শিউলিমাস, শিউলিমাসের গায়ে লেগে আছে পুজোর আনন্দ। আমার কাছে পুজো মানে একটা ঋতুর গায়ে লেগে থাকা গন্ধ, ভোরের শিশিরে ভিজে থাকা ঘাস, কুয়াশার বুক চিরে উঠে আসা সূর্য, কিংবা সন্ধ্যার হলুদ আলোয় মাতাল হয়ে থাকা ছাতিমের রাস্তা। আমার কাছে পুজো যতটা না উৎসবের, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকৃতির। পুজো আসার যে একটা গন্ধ আছে, আমি বোধহয় সেই গন্ধটারই প্রেমে পড়ি।
ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে থাকতে পুজোর ভোরগুলো শুরু হতো শিউলি দিয়ে। রাত্রের ঝড়ে পড়া শিউলি ভোরে মাটির গায়ে জড়িয়ে আমাদের জানান দিত, পুজো এসেছে। আমাদের পাশের বাড়িতে দুটো শিউলিগাছ ছিল। সেই বাড়ির জেঠিমা ভোরবেলা ডাক দিতেন, আর আমি প্রায় ছুটতে ছুটতে গিয়ে হাজির হতাম গাছতলায়। তখনও পৃথিবীটা বোধহয় পুরোপুরি জেগে উঠত না। চারপাশে একটা নরম, ঘুমঘুম আলো, মাটিতে ছড়িয়ে থাকা সাদা-কমলা ফুলের বিছানা। আমি গাছের তলায় নিজের মনে গান গাইতাম, কখনও লুটোপুটি খেয়ে, কখনও দুহাত ভরে ফুল কুড়িয়ে ভরিয়ে ফেলতাম সেই বিশাল ঝুড়িটা। কী আশ্চর্য আনন্দ ছিল সেই সামান্য কাজে! মনে হতো, ভোরবেলাটা বুঝি একান্তই আমার, আর এই ফুলগুলো আমারই ছোট্ট পৃথিবী।
ঝুড়ি ভর্তি শিউলি চলে যেত পাড়ার পুজোয়। তার মধ্য থেকে কিছু ফুল আমারও থাকত। সেগুলো দিয়ে মালা গাঁথতাম, আর সেই মালা গাঁথতে গাঁথতেই কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে যেত, টেরই পেতাম না। পুজোর আনন্দ তখন খুব সহজ ছিল, অথচ কী গভীর! এত আয়োজন, এত আলো, এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও আমার আনন্দ লুকিয়ে থাকত মাটিতে পড়ে থাকা কয়েকটা ফুলের মধ্যে।
ক্লাস এইট-নাইন পর্যন্ত পরিবারের সবার সঙ্গে পুজো দেখতে বেরোনো, বাইরে খাওয়া, নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়ানো—সবই ছিল। ঠিক যেমন আর পাঁচটা বাঙালি পরিবারের পুজো কাটে। কিন্তু আমার ভেতরে বোধহয় অন্য একটা পুজোও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল, যে পুজোকে মানুষের ভিড়ের চেয়ে নিঃসঙ্গ ভোর বেশি টানত, আলোর চেয়ে আলো ফোটার মুহূর্ত, আর উৎসবের চেয়ে উৎসবের আগমনী।
তারপর ক্লাস টেনের পর যখন ঝাড়গ্রামে গেলাম, পুজোটা যেন অন্য একটা রূপ নিল।
সেই সময় আমার পুজো মানেই ছিল ভোরবেলা হাঁটতে বেরোনো। ঝাড়গ্রামের ভোরে তখন শীতের একটু একটু করে আগমন, বাতাসে কেমন একটা শিরশিরে ভাব, চারপাশে হালকা কুয়াশা। পিচের রাস্তার দুপাশে সারি সারি শালগাছ, তাদের দীর্ঘ ছায়া, পাতার ফাঁকে জমে থাকা রাতের অন্ধকার। সেই শালবন পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই একটা মাঠ—মাঠজুড়ে কাশফুল।
ভোরের প্রথম আলো যখন কাশফুলের মাথায় এসে পড়ত, তখন দূরের আকাশ যখন ধীরে ধীরে রং যেন বদলে যেত! তখন মনে হতো পৃথিবী বুঝি খুব গোপনে নিজের সমস্ত সৌন্দর্য মেলে ধরছে। এমন কিছু দৃশ্য থাকে, যাদের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ হঠাৎ খুব নীরব হয়ে যায়। মনে হয়, এত সুন্দর পৃথিবীতে এত কিছু বলারই বা কী আছে! সূর্য উঠত, কাশের বন আলোয় ভরে যেত, আর আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম। সেই মুহূর্তটুকু কাউকে বোঝানোর জন্য আমার কোনও ভাষা ছিল না, আজও নেই।
বাড়ি ফেরার সময় এক আকাশ কুয়াশা মেখে ফিরতাম। গ্রামের বাড়ির সেই শিউলিগুলোকে খুব মনে পড়ত। ঝাড়গ্রামে তখনও তেমন বন্ধু হয়নি। এমনিতেই আমার বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা বরাবরই কম, নিজের সঙ্গে সময় কাটানোতেই আমার বোধহয় বেশি স্বস্তি। তাই একা একাই ঘুরে বেড়াতাম। সেই মাঠ শুধু আমার ভোরের ঠিকানা ছিল না, বিকেলেরও ছিল। কোনও কোনও দিন সূর্যাস্ত দেখতে যেতাম সেখানে। আকাশের রং কীভাবে বদলে যায়—কমলা থেকে লাল, লাল থেকে বেগুনি, তারপর ধীরে ধীরে গাঢ় নীল—তা দেখতে দেখতে মনে হতো, প্রকৃতি প্রতিদিন একই দৃশ্যের মধ্যে নতুন কোনও গল্প লিখে রেখে যায়।
সেই রংগুলোর নাম আমি জানি না। শুধু জানি, সেগুলো দেখলে আমার মন ভালো হয়ে যেত। কখনও আবার অকারণেই মন খারাপ হতো। কোনও সুন্দর মুহূর্তকেই চিরকাল ধরে রাখা যায় না।
এইভাবেই কেটে গেল দুটো পুজো। দুটো বছর। শিউলি থেকে কাশ, গ্রামের ভোর থেকে শালবনের কুয়াশা—আমার পুজো তখন ধীরে ধীরে আমার নিজের হয়ে উঠছিল।
তারপর লালধুলো পেরিয়ে কংক্রিটে পা। পড়াশোনার সূত্রে কলকাতায় আসা।
চারদিকে এত ভিড়, এত গরম, এত উঁচু উঁচু অট্টালিকা, এত আলো—এর মধ্যে আমি আমার পুজোটাকে কোথায় খুঁজে পাব? কোথায় সেই কুয়াশা, কোথায় শিউলির গন্ধ, কোথায় সেই নির্জন মাঠ, যার সামনে দাঁড়িয়ে একা একা সূর্যোদয় দেখা যায়? মনে হতো, আমার চেনা পুজোটা বুঝি কোথাও পিছনে পড়ে রইল।
তারপর একদিন, এমনই সিনেমা দেখতে নন্দনে গিয়েছি। সিনেমা দেখা শেষে একাডেমির সামনে চা খেতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল ছাতিমগাছ। সেই গাছের গায়ে, পাতায়, বাতাসে যেন তখন পুজোর সমস্ত আয়োজন। কী যে আনন্দ হয়েছিল! মনে হয়েছিল, আরে, এ তো আমারই চেনা ঋতু! সে এখানে আছে, শুধু তার পোশাকটা বদলে নিয়েছে।
ভিক্টোরিয়া থেকে নন্দন পর্যন্ত রাস্তাটার সঙ্গে তখন এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল আমার। রাস্তার দুপাশে ছাতিমগাছ, সন্ধ্যার হলুদ আলো, বাতাসে ছড়িয়ে থাকা সেই তীব্র, মাতাল করা গন্ধ—আমি হাঁটতাম। কখনও কোনও বিশেষ গন্তব্য থাকত না, কখনও থাকত না কারও সঙ্গে দেখা করার তাড়া। শুধু হাঁটতাম, আর মনে হতো, এই পথটুকুর মধ্যে কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়া গ্রামটা লুকিয়ে আছে।
ছাতিমের গন্ধে আমার গ্রামের শিউলির কথা মনে পড়ত, হলুদ আলোয় ঝাড়গ্রামের সূর্যাস্ত। কলকাতার এই ব্যস্ত রাস্তার মধ্যেও আমি নিজের মতো করে একটা নির্জনতা খুঁজে পেয়েছিলাম। কখন যে সন্ধে পেরিয়ে রাত নেমে আসত, বুঝতেই পারতাম না। তারপর হঠাৎ মনে পড়ত, ন’টার মেট্রো ধরতে হবে! তাড়াহুড়ো করে ফিরতাম, অথচ মনে হতো, ফেরার সময়টুকু যেন একটু ধীরে কাটে। আরও কিছুক্ষণ যদি থাকা যেত! আরও কিছুটা ছাতিমের গন্ধ যদি সঙ্গে নিয়ে ফেরা যেত!
এখন ভাবলে মনে হয়, আমার পুজোগুলো আসলে আলাদা আলাদা জায়গায় কাটেনি। তারা প্রত্যেকেই একে অপরের সঙ্গে কোথাও না কোথাও জুড়ে আছে। গ্রামের শিউলিগুলো ঝাড়গ্রামের কাশফুলের মধ্যে এসে মিশেছে, ঝাড়গ্রামের কুয়াশা কলকাতার ছাতিমগন্ধ সন্ধ্যায় আশ্রয় নিয়েছে। জায়গা বদলেছে, বয়স বদলেছে, বদলেছে জীবনের কত কিছু; শুধু পুজোকে অনুভব করার ধরনটা বোধহয় বদলায়নি।
আজও আমার পুজো মানে খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া। বাতাসে একটু ঠান্ডা আছে কি না, কোথাও শিউলি ফুটেছে কি না, আকাশের রং কেমন—এসব খেয়াল করা। আমার পুজো মানে কোনও এক অচেনা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পরিচিত কোনও গন্ধ পেয়ে থমকে দাঁড়ানো। আমার পুজো মানে সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সমস্ত দুঃখ, অভিমান, একাকিত্বকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকা।
জানি না কেন, পুজোর দিনগুলোর চেয়ে পুজো আসার দিনগুলোই আমাকে বেশি টানে। যখন বাতাসে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন টের পাওয়া যায়, শিউলি ফুটতে শুরু করে, কাশফুলেরা মাঠের বুকে সাদা ঢেউ তোলে, আর ছাতিমের গন্ধ সন্ধ্যাবেলাকে একটু বেশি বিষণ্ণ, একটু বেশি সুন্দর করে তোলে। তখন মনে হয়, পৃথিবী বুঝি তার সমস্ত ক্লান্তি সরিয়ে আবার নতুন করে বাঁচতে শিখছে।
একটা ঋতুর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত প্রেম। যে প্রেমে খুব বেশি কথা নেই, কাউকে কিছু প্রমাণ করার নেই, শুধু আছে কিছু গন্ধ, কিছু রং, কিছু হারিয়ে যাওয়া সকাল আর ফিরে ফিরে আসা স্মৃতি।
ঠাকুর দেখার জন্য আমার মন যতটা না ছটফট করে, তার চেয়ে অনেক বেশি করে পুজোর আগের সেই পৃথিবীটাকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখার জন্য।
যে পৃথিবীতে ভোর হলে শিউলি ঝরে, কাশফুলের মাথায় সূর্য ওঠে, শালবনের গায়ে কুয়াশা জমে, আর সন্ধে নামলে ছাতিমের গন্ধে ভরে যায় রাস্তা।
পুজো আসে, পুজো চলে যায়। কিন্তু সেই গন্ধগুলো থেকে যায়। কোথাও মাটির গভীরে, কোথাও স্মৃতির ভাঁজে, কোথাও বহুদিন আগে ফেলে আসা কোনও গ্রামের উঠোনে।
আর আমি, প্রতি বছর, সেই গন্ধের টানেই আবার ফিরে যাই আমার পুরোনো পুজোগুলোর কাছে। ছাতিম, কাশ, পলাশ টানে বরাবর, যতটা টানা যায়।

