বাংলার শারদোৎসব মানেই আলোর রোশনাই, থিম পুজোর ভিড় আর আধুনিকতার ছোঁয়া,কোথাও আবার বনেদিয়ানা। এই চকমকে আধুনিকতার বহু দূরে, রাঢ় বাংলার নিভৃত কোণে প্রকৃতির কোলে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু স্থান, যা আমাদের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাসের সোনালী দরজায় পৌঁছে দেয়। পুরুলিয়া জেলার আড়শা ব্লকের অন্তর্গত কংসাবতী নদীর তীরে অবস্থিত জঙ্গলঘেরা দেউলঘাটা এমনই এক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিস্ময়। এখানকার প্রাচীন পোড়ামাটির মন্দির এবং দেবীর অদ্ভুত রূপ ঘিরে রয়েছে বহু শতাব্দী পুরনো রহস্য ও লোকগাথা। ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন দুর্গা মূর্তি৷
আনুমানিক পাল ও সেন বংশের আমলে (নবম-দশম শতাব্দীতে) কংসাবতীর (তৎকালীন কংসসাই নদী) অববাহিকায় দেউলঘাটা গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ গবেষক জে. ডি. বেগলার এবং ই. টি. ডালটনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় এই অঞ্চলে ছোট-বড় প্রায় ১৫টি মন্দির ও দেউলের অস্তিত্ব ছিল। কালের গ্রাসে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ বেশিরভাগই ধবংসস্তূপ।
এখানকার মন্দিরগুলির নির্মাণশৈলীতে বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপত্যের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। মন্দিরের প্রবেশদ্বারগুলি সাধারণত ত্রিভুজাকৃতি বা কর্বেটেড আর্চের হয়ে থাকে।
রেখ-দেউল প্রকৃতির এই মন্দিরগুলি পোড়ামাটি এবং স্টুকো কাজের চমৎকার নজির। মন্দিরগাত্রের অলংকরণ শৈলী অনেকখানি বিহারের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারগুলির সঙ্গে মিলযুক্ত।
দেউলঘাটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার কষ্টিপাথরে খোদিত প্রাচীন দুর্গা বা মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিটি, যা প্রচলিত চেনা দুর্গা রূপ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মূর্তির গঠনশৈলীতে প্রাচীন শিল্পরীতির অপূর্ব মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।

এখানকার দেবীর বর্ণ কৃষ্ণাভাব বা কালো। দেবীর মূর্তির মাথার উপরে রয়েছে একটি বিশেষ চক্র স্তম্ভ। পায়ের তলায় এবং চালচিত্রের গায়ে অবিকল উড়ন্ত গন্ধর্ব বা পরীদের মূর্তি খোদাইন করা, যা প্রাচীন জৈন বা বৌদ্ধ ভাস্কর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
দুর্গাপুজোয় সপরিবারে দেবীর যে রূপ আমরা দেখি (লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ), দেউলঘাটার এই প্রতিমায় তাদের কাউকেই দেখা যায় না। তবে দেবীর দু’পাশে অষ্টমাতৃকা রূপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।সাধারণ প্রতিমায় দেবীর ডান পা সিংহের উপর এবং বাঁ পা মহিষাসুরের পিঠে থাকে। কিন্তু দেউলঘাটার এই মূর্তিতে ঠিক উল্টোটি অর্থাৎ দেবীর ডান পা মহিষের উপর এবং বাঁ পা সিংহের উপর রয়েছে।
ঐতিহাসিকদের মতে, দেউলঘাটার এই অঞ্চলটি মূলত প্রাচীনকালে জৈন ও পরবর্তীকালে শাক্ত সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল। জনশ্রুতি রয়েছে যে, মূল মন্দির বা দেউলগুলি তৈরি হলেও বহু বছর ধরে এই মাতৃমূর্তিটি একটি গাছের তলায় উন্মুক্ত আকাশের নিচে পূজিত হতো। পরবর্তীকালে স্থানীয় বাসিন্দারা মন্দিরের ভেতরে বা এর সংরক্ষণে এগিয়ে আসেন।
মহালয়ার দিন থেকেই এই প্রাচীন মন্দিরে পবিত্র চণ্ডীপাঠ শুরু হয়ে যায়। জাঁকজমক ও আলোর রোশনাই না থাকলেও এখানকার আদিম আভিজাত্য এবং নিস্তব্ধ পরিবেশ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে গবেষক, পর্যটক এবং সাধারণ মানুষ ভিড় জমান। এমনকি ভিনদেশ থেকেও বহু মানুষ এই প্রাচীন ইতিহাসের টানে দেউলঘাটায় উপস্থিত হন।
অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদে ভরপুর দেউলঘাটা আজ চরম অবহেলায় ধুঁকছে। ২০০২ সালে সংস্কারের কাজের সময় একটি বিশাল পোড়ামাটির মন্দির প্রবল বর্ষণে ধসে পড়ে। কংসাবতীর ভাঙন, চারিদিকে বুনো জঙ্গল এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় এই ঐতিহাসিক নিদর্শন আজ বিলুপ্তির পথে।দেউলঘাটার এই প্রাচীন ঐতিহ্য কেবল একটি পুজোর স্থান নয়, এটি রাঢ় বাংলার সুপ্রাচীন ধর্মীয় বিবর্তন ও ভাস্কর্য শিল্পের অমূল্য দলিল।

