ধ্বংসস্তূপে শিক্ষার আলো: গাজায় ফিরল শিশুরা

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে চলা নজিরবিহীন সংঘাত, রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান এবং চরম অনিশ্চয়তার পর ১৯ সেপ্টেম্বর গাজায় নতুন শিক্ষাবর্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এই শিক্ষা কার্যক্রমে প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার শিশু ও শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। তবে এই প্রত্যাবর্তন কোনো সাধারণ শিক্ষাবর্ষের সূচনা নয়; এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এক দুঃসাহসী লড়াই। যুদ্ধের ভয়াবহতায় গাজার প্রায় পুরো শিক্ষাকাকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। বেশিরভাগ স্কুল ভবন হয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নতুবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে পরিণত হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই লাখ লাখ শিশুকে তাবু, ক্ষতিগ্রস্ত ক্লাসের অবশিষ্টাংশ এবং অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে ক্লাস করতে হচ্ছে।


​ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর একটি বড় অংশ পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ বা বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া ব্যবহার করার কোনো উপায় নেই। বর্তমান শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত চেয়ার, ডেস্ক, বিদ্যুৎ বা পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের তীব্র সংকট রয়েছে। বহু শিক্ষার্থীকে কনকনে শীত কিংবা তীব্র গরমে খোলা আকাশের নিচে বা তাঁবুর মাটিতে মাদুর পেতে বসে বই-খাতা হাতে পড়াশোনা চালাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে শিখন ঘাটতি৷

গাজায় তাঁবু খাটিয়ে চলছে স্কুল


​গাজার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল সাধারণ যুদ্ধাপরাধ বা অবকাঠামোগত ক্ষতি নয়; এটি মূলত একটি পুরো প্রজন্মকে মেধাহীন ও পরাধীন করে রাখার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাগারগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার যে নীতি, গাজার ক্ষেত্রে তার নির্মম বাস্তবায়ন ঘটেছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শত শত শিক্ষক এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি শিশুদের ভবিষ্যৎ, ইতিহাস ও স্বাধিকারের চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে৷


​এত প্রতিকূলতা, খাদ্যাভাব, নিরাপত্তাহীনতা এবং পরিজন হারানোর গভীর ট্রমা সত্ত্বেও গাজার শিশুদের শিক্ষার প্রতি অদম্য স্পৃহা সারা পৃথিবীকে নাড়া দিয়েছে। খণ্ডবিখণ্ড জীবনের মধ্যে বইখাতা আঁকড়ে ধরে ক্লাসে উপস্থিত হওয়া প্রমাণ করে যে—বোমা ও বারুদ একটি জনপদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের জ্ঞানার্জনের স্পৃহা ও মুক্তির আকাঙক্ষাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে না। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গাজার শিশুদের এই পঠন-পাঠন কেবল একটি নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু নয়, এটি কঠিনতম অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার এক অদম্য মানবিক প্রতিচ্ছবি।

অন্যান্য প্রতিবেদন.