যেসব অমলকান্তিরা রোদ্দুর হতে চায় তাদের সবার একটা আশ্রয়স্থল আছে। শিয়ালদা থেকে দক্ষিণে কয়েকটা স্টেশন পরেই যাদবপুর স্টেশন, সেখানেই জায়গাটা – বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চমাধ্যমিকে আশানুরূপ ফল হয়নি? চিন্তা নেই! আছে প্রবেশিকা পরীক্ষার স্বস্তি। আছে পকেট কিন্তু পকেট গড়ের মাঠ? ভয় কী? তবু যদি তুমি আসতে চাও, খোলা আছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটা গেট। মাত্র ১২৩৫/- টাকায় ভর্তি হয়ে যেতে পারো এখানে। অর্থাৎ অমলকান্তিকে আর রোদ্দুর হতে না পারার জন্য দুঃখ করতে হবেনা।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের হাত ধরে জন্ম নেওয়া জাতীয় শিক্ষা পরিষদই আদতে আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তাই সেই প্রতিরোধের স্পৃহা বহন করে চলেছে আজও। এ. পি. জে আব্দুল কালাম তার আত্মজীবনীতে এখানকার ল্যাব এবং গবেষণাগার সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। সামগ্রিক ভারতবর্ষের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবদান ও ভূমিকা তা নিয়ে বারংবার অনেক লেখাপত্রে পাওয়া যায়। তবে বারেবারে কটাক্ষের সুর ভেসে আসে আর্টস ফ্যাকাল্টির ছাত্রছাত্রীদের দিকে লক্ষ্য করে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ভিডিও ভাইরাল হলেই তাদের দিকে লক্ষ্য করে ভেসে আসে নানান কুমন্তব্য – সাইন্স এ ইঞ্জিনিয়ারিং এ না পড়াটাই যেন তাদের মস্ত বড় ভুল। কিন্তু যদি কেউ হঠাৎ পথ ভুল করে চার নম্বর গেট দিয়ে ঠকে হাতি বরান্দায়, গান্ধী ভবনের চাতালে, গ্রিন জোনে বা ওএটির চত্বরে পড়ন্ত সন্ধ্যায় সান্ধ্য গানের ঠেকে উঁকি ঝুঁকি মারে, তাহলে দেখবে এখানে একইসঙ্গে লালন এবং কবীরের গান হয়, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর গজলের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। এই সান্ধ্য আড্ডার ঠেকে আসলে “পড়াশুনা না করা” আর্টসের ছেলেমেয়েরাই থাকে, এমনটা কিন্তু একদমই না। তিন ফ্যাকাল্টি জোড়া ছেলেমেয়েদের অবাধ যাতায়াত এই ঠেকে। কারণ তারা “Dead Poet Society” এর John Keating এর কথায় বিশ্বাস রাখে – ” Medicine, law, . Business, engineering these are noble pursuits and necessary to sustain life. But poetry, beauty, romance, love these are what we stay alive for.”

তাই প্রত্যেক বছর নিয়ম করে সুবর্ণ জয়ন্তী অথবা পার্কিং লটে পথনাটিকার প্রতিযোগিতা হয়। নাচে, গানে, স্লোগানে নতুনভাবে জেগে ওঠে যাদবপুরের চিরাচরিত প্রতিরোধের সুর। ক্যাম্পাসের আদরের দেওয়ালে রং তুলির আঁচড়ে জেগে ওঠে ফ্যাসিবাদবিরোধী ম্যুরাল, গ্রাফিতি। একদিকে সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্র, অপরদিকে আমাদের প্রতিবাদের ভাষা। এই নিয়েই ক্যাম্পাসের কোণায় কোণায় চলতে থাকে রিহার্সাল, শাসকের শোষণযন্ত্রকে প্রতিহত করার মহড়া। শেষমেশ শাসকের বুলডোজার হেরে যাবে, আর আমরা জিতব, এই স্বপ্নকে বাঁচানোর লড়াই চলতে থাকে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আসলে জানে যে এই পাঁচটা গেটের বাইরেই প্রতিদিন জন্মায় আর মরে আসল পৃথিবী। যে পৃথিবীতে প্রতিদিন অনাহারে মরে শিশু, লাথি খায় দলিত, ধর্ষিতা হয় নারী। তাই যাদবপুর উত্তাল হয় শিক্ষার দাবিতে, স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার দাবিতে। দেশজুড়ে NEET পরীক্ষা, NET পরীক্ষায় এত দুর্নীতি। প্রতিদিন বাড়ে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার সংখ্যা। শিক্ষাখাতে ব্যয়বরাদ্দ কমছে প্রতিদিন। নেই নতুন অধ্যাপক নিয়োগ। বিপদের মুখে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা।
চুপ থাকব আমরা? চুপ থাকবে যাদবপুর? ছাত্র অধ্যাপক কর্মচারী গবেষক সকলে মিলে গড়ে তোলে প্রতিরোধ। প্রতিদিন মিছিলে নতুন মুখ যোগ হয়। ভেঙে যায় চারের গেটের এম্বলেম, কিন্তু যাদবপুরের ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা কখনো ভাঙ্গেনা। অরবিন্দ ভবনের বুকে যে আগুন লেগেছিল তা নিজের মনের মধ্যে জাগিয়ে রাখে যাদবপুর। যাদবপুর যেমন জানে সবসময় লাঠির বদলে লাঠি চালিয়ে সঠিক জবাব দেওয়া যায় না, তেমন যাদবপুর এটাও জানে কাঁধে থাকা ঝাণ্ডাটাকে ঘুরিয়ে কখন ডান্ডার মত ব্যবহার করতে হয়।

আসলে যাদবপুর আমাদের শেখায় আনলার্ন করার গোপন ট্যাকটিক্স। আজন্মলালিত পুঁজিবাদের, পিতৃতন্ত্রের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে শেখায় নতুন চেতনার জগৎ বেছে নিতে। যে রাজনীতি আমাদের থেকে প্রতিদিন আমাদের পড়াশোনার মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে, সেই রাজনীতিকে আটকাতে হলে আমাদেরও রাজনীতি করতে হবে। কিন্তু এই রাজনীতি হবে ভালোবাসার রাজনীতি, যা উগ্র দক্ষিণপন্থির বিভাজনের রাজনীতির উল্টোদিকে মানুষকে ভালবাসার কথা বলে। আসলে ভালবাসতে না জানলে তো জীবনের ষোল আনাই ফাঁকি। যাদবপুর আমাদের শেখায় ভালবাসা আর রাজনীতি এই শব্দদুটো আসলে একটি কয়েনের এপিঠ আর ওপিঠ। এর বাইরে অন্য কোন মানে থাকলে তা আসলে ভাওতাবাজি।
যাদবপুর নিয়ে তাই দক্ষিণপন্থীরা যতই খারাপ কথা বলুক। না কেন, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নাচে গানে থিয়েটারে যাদবপুর বেশ ভালোই আছে। আসছে বছর আরো অনেক অনেক অমলকান্তি যাদবপুরে রোদ্দুর হতে আসবে। যাদবপুর তখন সব পরনিন্দা পরচর্চার মুখে ছাই দিয়ে গাইবে – “তবু যদি তুমি আসতে চাও, খোলা আছে আমার দুহাত। যেন এখানে নেই কোন হিসেব, শুধু আছে নীল আকাশ’। অতএব সমাজের সব শিখিয়ে দেওয়া বিভাজনের উল্টোদিকে, গোঁড়ামির উল্টোদিকে নিজেকে যদি নিজের মতো করে ভালবাসতে চাও, তাহলে ” ফেলে রেখে দিয়ে পিছুটান, চলে এসো, চলে এসো।”

