অন্নপূর্ণার টাকা না পেয়ে পঞ্চায়েত অফিসে তালা,বিক্ষোভ বিজেপি মহিলা মোর্চার

১১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

রাজ্যে ফের একবার অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল। আবেদনের চার মাস পার হয়ে গেলেও বহু মহিলার অ্যাকাউন্টে এখনও ঢোকেনি মাসিক ৩,০০০ টাকা, আর এই ক্ষোভেই সোমবার মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর, নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জ, হুগলির পোলবা, পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর ও হাওড়ার পাঁচলা একযোগে উত্তাল হয়ে ওঠে একাধিক জেলা।

মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুর-১ ব্লকের মহিলারা এই মাসেও টাকা না পেয়ে বিডিও দেবাশিস সামন্তের সঙ্গে দেখা করতে যান। কিন্তু অফিসের দরজায় ব্যারিকেড ও পুলিশ-সিভিক ভলান্টিয়ারের পাহারা দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁরা। বিক্ষোভকারীদের সরাসরি অভিযোগ, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ির মালিকরা নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন, অথচ প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলিই বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে বারবার আবেদন সত্ত্বেও।

নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লক অফিসের সামনে সকাল থেকেই স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যান মহিলারা, যার জেরে ব্লক অফিসের স্বাভাবিক কাজকর্ম কিছুক্ষণের জন্য ব্যাহত হয়। তাঁদের অভিযোগ, একই সময়ে একই নিয়মে আবেদন করা সত্ত্বেও প্রতিবেশী কেউ কেউ নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন, অথচ তাঁরা বঞ্চিত,যা স্পষ্টতই প্রশাসনিক স্তরে তালিকা তৈরিতে অসঙ্গতির ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর প্রশাসনের আশ্বাসে বিক্ষোভ ওঠে।

হুগলির পোলবার সুগন্ধা পঞ্চায়েত অফিসে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভ দেখান খোদ শাসকদল বিজেপির মহিলা মোর্চার কর্মীরাই, এমনকি অফিসে তালা পর্যন্ত ঝুলিয়ে দেন তাঁরা। বিক্ষোভকারী সুপর্ণা সরকার জানান, জুলাইয়ে আবেদন করেও তিন মাস ধরে শুধু অপেক্ষার কথাই শুনছেন। দলীয় কর্মী রাখী মালিকের অভিযোগ আরও স্পষ্ট। যোগ্য হয়েও দলীয় পরিচয় তাঁদের টাকা পাইয়ে দিতে পারেনি। চুঁচুড়ার বিধায়কের কাছে গিয়েও সুরাহা না হওয়ায় শেষমেশ পঞ্চায়েত অফিসেই বিক্ষোভে নামেন তাঁরা।খড়্গপুর পুরসভার গেটের সামনে রাজ্য সড়ক অবরোধ করেন মহিলারা। পুলিশের আশ্বাসে অবরোধ উঠলেও পুরপ্রধানের অফিস ঘিরে বিক্ষোভ চলতে থাকে। পুরপ্রধান কল্যাণী ঘোষ আবেদনপত্র জেলাশাসকের কাছে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

হাওড়ার পাঁচলা বিডিও অফিসের সামনে চার মাস ধরে টাকা না পাওয়ার অভিযোগে রাস্তা অবরোধ করেন মহিলারা। একই দাবিতে উদয়নারায়ণপুরেও পৃথক পথ অবরোধ হয়।
এছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জলপাইগুড়ি ও ময়নাগুড়ির বিডিও অফিসেও একই দাবিতে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এই সংকট কোনো একটি জেলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, রাজ্যজুড়েই বিস্তৃত একটি কাঠামোগত সমস্যা।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভার্চুয়াল ভাষণে দাবি করেছিলেন, রাজ্যের দেড় কোটি মহিলার অ্যাকাউন্টে চতুর্থ কিস্তি পৌঁছে যাচ্ছে, আর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই দিনটিকে ভবানীপুরে “অন্নপূর্ণা দিবস” হিসেবে বিশেষভাবে উদ্‌যাপন করেন। অথচ ঠিক তার চার দিনের মাথায়, সোমবার ফের একযোগে ছয়টি জেলায় বিক্ষোভের ঘটনা ঘটল। প্রশাসন প্রতিবারই আশ্বাস দিচ্ছে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে, কিন্তু জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়। ফলে প্রতি মাসেই কিস্তি ঘোষণার পর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, আর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে।

রাজ্যে অন্নপূর্ণা যোজনা চালু হয়েছিল এ বছর জুলাই মাসে, যোগ্য মহিলাদের মাসিক ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু প্রকল্প চালুর একেবারে গোড়া থেকেই টাকা বিলি নিয়ে সমস্যা লেগেই রয়েছে। আগস্ট মাসেই বিভিন্ন জেলায় প্রথম বড় আকারে বিক্ষোভ দেখা দেয়, যার জেরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২০ আগস্ট বেলা ১২ টার মধ্যে সব যোগ্য মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং ব্যর্থ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু সেই সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও সমস্যা মেটেনি, উল্টে সেপ্টেম্বরে ফের একই চিত্র দেখা গেল।

প্রশাসনিক সূত্রে মূলত তিনটি স্তরে সমস্যা জানা যাচ্ছে। প্রথমত, প্রায় ১৭ লক্ষ আবেদন নথিগত ত্রুটি বা যাচাইকরণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আটকে বা বাতিল হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, বিশাল সংখ্যক উপভোক্তা একসাথে প্রকল্পের আওতায় আসায় প্রশাসনিক স্তরে যাচাই ও অর্থ বিতরণের গতি ধীর হয়ে পড়েছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক চাপানউতোরও প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। এদিকে বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল অভিযোগ তুলেছেন, দলের অন্দরে বসেই তৃণমূল সমর্থকরা ইচ্ছাকৃতভাবে গোলমাল পাকাচ্ছেন, যদিও এই দাবির স্বপক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। ফলে প্রতি মাসেই কিস্তি দেওয়ার তারিখ ঘোষণা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে বড় অংশের মহিলা সেই টাকা হাতে পাচ্ছেন না, আর সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.