ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬— বইপাড়া আজ সাক্ষী থাকলো এক অন্য ইতিহাসের৷ সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শারদীয়া বুকস্টল এবং বইয়ের বিপণন কেন্দ্রগুলির উপর নেমে আসা বর্বরোচিত আক্রমণ ও বুলডোজারের আস্ফালনকে প্রতিহত করতে আজ কলকাতার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ নেমেছিলেন এক অভিনব পদযাত্রায়। যার নাম দেওয়া হয়েছিল—”বইয়ের জন্য হাঁটুন”। কোনো রাজনৈতিক দলের পতাকা নয়, শত শত মানুষের হাতে বই নিয়ে এই নীরব পদযাত্রা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানব সভ্যতার চিরন্তন আত্মরক্ষার লড়াই।
সাম্প্রতিক অতীতে যাদবপুর সহ পশ্চিমবঙ্গের একাধিক অঞ্চলে প্রগতিশীল ও বামপন্থী রাজনৈতিক বুকস্টল ভাঙচুর এবং বুলডোজার দিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাগুলি কেবল কিছু কাঠের তাক বা কাগজের স্তূপ ধ্বংস করার চক্রান্ত নয়, এটি ভিন্নমত, মুক্ত চিন্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এক বিপজ্জনক ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। ক্ষমতার অলিন্দে যখনই স্বৈরাচারী মনোভাবের বিস্তার ঘটে, তখনই শাসককুল প্রথম আঘাত হানে সাহিত্যের উপর। কারণ বই এমন এক বারুদ, যা মানুষের মস্তিষ্ককে শাণিত করে এবং প্রশ্ন করতে শেখায়। বুকস্টলে বুলডোজার চালানোর এই ঘটনা ক্ষমতার অন্ধ হিংস্রতা এবং সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ করার রাজনৈতিক অভিসন্ধিরই এক নির্মম দলিল।
আজকের এই মিছিলে ছিল না কোনো উগ্র স্লোগান, ছিল না কোনো শক্তির প্রদর্শন। কলেজ স্কোয়ারের বিদ্যাসাগর মূর্তির পাদদেশ থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রায় ছিল এক অদ্ভুত পরাধীনতাহীন প্রতিবাদের ভাষা। প্রত্যেকের হাতে ছিল একটি বা একাধিক বই—কারও হাতে প্রিয় কোনো কবিতার বই, কারও হাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাশিয়ার চিঠি’-র মতো কালজয়ী সৃষ্টি। যেখানে শাসকপক্ষ ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে বুলডোজারকে, সেখানে সাধারণ মানুষ সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে বইকে। এটি এক নীরব অথচ বজ্রকঠিন রাজনৈতিক বার্তা—যেখানে ইট-পাথরের ধ্বংসলীলার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে অক্ষরের প্রাণশক্তি।

”বই পুড়াতে নেই, বই পড়তে হয়; বই ছিঁড়তে নেই, বই পড়তে হয়”—এই সরল অথচ গভীর স্লোগানটি আজ কলেজস্ট্রিটের মাটিকে প্রকম্পিত করেছে। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, হিটলারের জার্মানি থেকে শুরু করে যুগে যুগে স্বৈরাচারীরা বই পুড়িয়ে মানবসভ্যতাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে জেগে উঠেছে মানুষের বিবেক। আজকের কলকাতা প্রমাণ করল, বন্দুক বা বুলডোজারের সামনে একটি বইয়ের পাতা অনেক বেশি শক্তিশালী। এই পদযাত্রা কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বুকস্টল ভাঙার প্রতিবাদ নয়, এটি বাংলার মুক্তমনা সংস্কৃতি, বহুত্ববাদ এবং গণতন্ত্রের টুঁটি টিপে ধরার বিরুদ্ধে আপামর সংস্কৃতিকামী মানুষের একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ৷
আজকের এই পদযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার নাম নয়। প্রতিদিনের যাপনে বাকস্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতা বজায় রাখার লড়াইই হলো প্রকৃত গণতন্ত্র। কলকাতার বইপাড়ার বুকে আজকের এই নীরব মিছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক দীপ্তিময় অধ্যায় হয়ে রইল। এটি প্রমাণ করল, যতবারই প্রগতির পথ রোধ করতে বুলডোজার নামানো হবে, ততবারই এ শহরের মানুষ হাতে তুলে নেবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মার্ক্সের মুক্ত অক্ষর—কারণ অন্ধকার যত গাঢ়ই হোক না কেন, একটি মাত্র বইয়ের সুপ্ত আলোই পারে সমগ্র তিমিরকে অবলুপ্ত করতে।

