রাজধানী দিল্লির বুকের সাম্প্রতিক চিত্র যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী, যুব অধিকারকর্মী, স্বাধীন সাংবাদিক, ইউটিউবার থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরের প্রবীণ আইনজীবী পর্যন্ত প্রশাসনের নজিরবিহীন দমনপীড়নের শিকার হচ্ছেন। মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা, ট্রেন আটকে দেওয়া, বিমানযাত্রীদের টার্মিনালের ভেতরে হেনস্থা করা এবং দিল্লির সমস্ত সীমান্ত সিল করে দিয়ে কাঁটাতার বা পেরেক বিছানো- এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আজ নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করতে কতটা মরিয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সর্বাত্মক পুলিশি বন্দোবস্তি ও ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে কি আদৌ জনজোয়ারের গতি রোধ করা সম্ভব?

রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, রাষ্ট্র যখন জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে শক্তি প্রয়োগের চরম পথ বেছে নেয়, তখন তা সাময়িকভাবে ভীতি তৈরি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে উল্টো ফল ডেকে আনে। একে তো রাজধানী দিল্লির মতো একটি সংবেদনশীল মেগাসিটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরুদ্ধ করে রাখা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব। যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিঘ্নিত হলে শুধু সাধারণ মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয় না, বরং সরকারের নিজস্ব কার্যকারিতাও ভেঙে পড়ে। ট্রেন-বাস বা বিমান চলাচল বন্ধ রেখে কিংবা বর্ডার সিল করে অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়ে কোনো সরকার দীর্ঘদিন দেশ চালাতে পারে না।
এই দমনপীড়ন ও নির্বিচার আটকের ঘটনাগুলো সমাজে এক ধরণের নীরব ক্ষোভ ও অনাস্থার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
যখন দেখি সুপ্রিম কোর্টের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় চত্বর থেকে আইনজীবীরা হেনস্থা বা আটকের শিকার হচ্ছেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে এই বার্তা স্পষ্ট হয়ে যায় যে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার আজ বিপন্ন। কমবয়সী ছেলেমেয়ে বা পড়ুয়াদের দিল্লি আসার পথে জোর করে নামিয়ে দেওয়া বা সাংবাদিকদের টার্গেট করা কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী আছে, বলপ্রয়োগ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে যত বেশি চাপানো হয়, মানুষের ভেতরে জমে থাকা দ্রোহের বিস্ফোরণ তত শক্তিশালী রূপ নেয়।

শেষ পর্যন্ত, এই ধরনের পরিস্থিতি সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও নৈতিক শক্তিকেই দ্রুত ক্ষয় করে দেয়। বলপূর্বক আটকে রাখা কিংবা পুলিশি রাষ্ট্রের চেহারা নিয়ে জনরোষ সামাল দেওয়া যায় না; বরং এটি সরকারের দুর্বলতা ও নিরাপত্তাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা যখন ফুঁসে ওঠে, তখন কাঁটাতার, পেরেক বা হাজার হাজার বাহিনী দিয়ে সেই স্রোতকে আটকে রাখা যায় না। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই বাড়াবাড়ি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভিতকেই নড়বড়ে করে তোলে, যা কোনো স্থিতিশীল সরকারের পক্ষেই দীর্ঘমেয়াদে মঙ্গলজনক নয়।

