পেশি আছে প্রশ্ন নেই জম্বি এলো দেশে

৮ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

যৌবনে অতীন্দ্রনাথ কুস্তির প্যাঁচ কষতেন। জোড়াবাগানের বসু পরিবারে অপূর্বকৃষ্ণ বসুর ছেলে অতীন্দ্রনাথ বসু। কুস্তি শিখেছিলেন ময়মনসিংহের রাজা জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরীর কাছে। সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রাঙ্গনে ভারতীয় প্রথায় তিনিই প্রথম কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন।

যুগান্তর বিপ্লবী দলে অতীন্দ্রনাথ ছিলেন অন্যতম নেতা। বেশ কয়েকবার কারাবরণের পর ১৯১৬ সালে থেকে পরবর্তী পাঁচ-বছর ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কেন্দ্র পরিচালনার দায়ে নির্বাসন ভোগ করতে হয় তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে ‘মহেশালয়’ নামের একটি স্কুল নির্মাণ করেছিলেন অতীন্দ্রনাথ। ১৯০৫-এ ‘ভারত ভান্ডার’ নামের সংস্থা তৈরি করেন। যুবকদের সুস্হ, সচেতন ও শক্তিশালি করে তোলার উদ্দেশ্যে ১৯২৬-এর ২রা এপ্রিল সিমলা ব্যায়াম সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৫ -এ তিনি দুর্গাপূজায় ‘সর্বজনীন’ শব্দটির প্রচলন করেন। যাতে দেশের মানুষ বিভেদ ভুলে একত্রে উৎসবে মেতে উঠতে পারে। পূজা প্রাঙ্গণের সঙ্গে স্বদেশী মেলার জুড়ে দেন তিনি। জমিদার বাড়ি ও বারোয়ারির বাইরে এই প্রথম ‘সর্বজনীন’ হন শারদীয়া। ১৯৩২ সালে ইংরেজ সরকার সিমলা ব্যায়াম সমিতিকে বায়ামের আড়ালে বিপ্লবী তৈরির আখড়া সন্দেহে – বেআইনি বলে ঘোষণা করে। এই সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তরা সিমলা ব্যায়াম সমিতির কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুজোকে উৎসবে বদলাতে সর্বজনীন বিষয়টা – অতীন্দ্রনাথের মাথায় আসে। এই বদলানো সময়ে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে – পুজো ও উৎসব – বিবাদে, কোথাও যেন আক্রান্ত ‘সর্বজনীন’। সুঠাম এক দেশপ্রেমিক, ব্যায়াম করছেন, যুবকদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, জেলে যাচ্ছেন, স্বদেশী মেলা করছেন, আর চাইছেন,- জমিদার বাড়ির অলিন্দ নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ পার করে – দুর্গা হয়ে উঠুন সবার। সর্বজনীন।

বিজয়া পার করে আবার অতীন্দ্রনাথ কেন? ১৯৬৫ সালে ৯৩ বছর বয়সে মারা গেলেন ‘সর্বজনীন’ শব্দের স্রষ্টা। সে বছর প্রথম প্রকাশ পেলো নারায়ণ দেবনাথের বাঁটুল ডি গ্রেট। স্বাধীনতা ১৮ বছর পার করে তখন বেশ সাবালক। কমিকসের বাঁটুল ১৭-১৮ বয়সের নব্য-যুবক। সে বছর শুকতারা পত্রিকায় নারায়ণ দেবনাথের বাঙালি সুপারহিরো – বাঁটুলের প্রবেশ। সেও এক দিন বদলের যুগ। ৪০ ইঞ্চি বুকের সুঠাম, পেশিবহুল বাঁটুল।

অমিত শক্তির অধিকারি বাঁটুলের গায়ে হাতুড়ি মারলে কাতুকুতু মনে হতে পারে! আস্ত কুমির, তিমি, হাতি জব্দ করে ফেলতে পারে সে। হাতে তুলে শূন্যে ঘুরিয়ে দিতে পারে চারচাকা। প্রয়োজনে দুর্ঘটনার আগে ধরে ফেলতে পারে চলন্ত ট্রেন। বুকে গুলি লাগলে – বড়জোর ‘খটাং’ আওয়াজ হবে! খাবার লাগে প্রচুর। অমন শক্তি মাঝেমাঝে বিপদ ঘটায়। এহেন বাঁটুলের সততা আর দেশপ্রেম কিশোর-মনে দেশহিতের ছবি আঁকতো। দেশহিত ছাড়া দেশপ্রেম যে বাতুলতা! তাই ৬৫-র ভারত-পাক যুদ্ধ বা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে – বাঁটুল হয়ে নারায়ণ দেবনাথের বাঁটুল পাড়ি দেন যুদ্ধে। বাংলার কিশোর-মন পড়ে, কৌতূহলী হয়। বাঁটুল – অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতীক। অহঙ্কারহীন সারল্যে ভরা বাঁটুলের মনজগতে জাতপাত, উঁচুনিচু ছিল না।বাঙালি মধ্যবিত্ত পাড়ার দস্যি বাচ্চু ও বিচ্ছু তাঁর সঙ্গী।
মধ্যবিত্ত জীবনে পাড়ার ক্লাব বা অঞ্চলে, খেলার মাঠে, মেলায়, বাৎসরিক উৎসব বা পরিবারের পরিসরে – আজও অতীন্দ্রনাথ বা বাঁটুল দি গ্রেট দেখতে পাই যেন! প্রবীণ হয়েছে তাঁরা, বা হচ্ছেন। সর্বদা সচল। নয়ের দশক থেকে যৌথ-পরিবারে ভাঙ্গন, অর্থনীতির বদল, সামাজিক সম্প্রীতির ওঠানামার মাঝে – তাদের স্মৃতির যৌথতা – আসর জমায়। সুস্থ-মন, বলবান শরীর আর দেশহিত। চারপাশের দশজনের সঙ্গে জুড়ে দশের দেশ।

সত্তরের রক্তাক্ত দশক এই মন্বন্তরের দেশে এনেছিল যৌবনের প্রশ্ন। উত্তাল সে সময় অকালে ঝরিয়েছে প্রাণ। নানা-চিন্তার বাংলায় এনেছে – প্রশ্ন করার অধিকার। সাবলীলতা। ক্রমে গ্রাম বদলেছে, শহর বদলেছে। সমকাল জুড়ে থেকেছে রামমোহনের দায়িত্ব, বিদ্যাসাগরের উদ্যোগ, ডিরোজিও’র খোঁজ, রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববীক্ষা। বহুবিধ বৈচিত্রের নতুন দেশ গড়ার তাড়না। বহুপথে, বহুর খোঁজ।

এহেন বঙ্গ দেশের প্রাত্যহিক শব্দবন্ধে যুক্ত হয়েছে – নতুন পরিচিতি –’জম্বি’। সময়ের গতি খুব। ট্রেনে, বাসে, বাজারে, গঞ্জে, মলে – অজস্র মানুষ চেয়ে আছে মোবাইল ফোনে। যান্ত্রিক নির্ভরশীলতা, চিন্তার নিষ্ক্রিয়তা, প্রশ্নহীন, অন্ধ অনুকরণ-প্রিয়, সহজে চালিয়ে দেওয়া মানুষ এরা। লক্ষ্য ও গন্তব্যহীন হয়ে সমাজের কুসংস্কার বা প্রচলিত ধারণাকে তারা বিশ্বাস করে। ধারন করে। মানসিক জড়তা, যা যৌক্তিক চিন্তাকে নস্যাৎ করে, অথচ, প্রশ্নই এই জীবজগতে মানুষকে – শ্রেষ্ঠ করেছে। ভালমন্দের বিচার, আত্মোপলব্ধি – যা সভ্যতার চালিকা ও নিয়ন্ত্রক – জম্বি এক বিপুল সংখ্যা হয়ে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে ঠায়।

পপুলার কালচারে বা হলিউডি সিনেমায় পচে যাওয়া শরীরের মাংসখেকো জম্বি দেখা গেলেও,- পশ্চিম আফ্রিকার শব্দ ‘নজাম্বি’ থেকে জম্বি শব্দটি এসছে। ‘ঈশ্বরের আত্মা’ বা ‘মৃতের আত্মা’ –এখানে ‘নজাম্বি’ বা ‘জম্বি’। আফ্রিকান দাসদের মাধ্যমে ক্যারিবীয় দ্বীপ হাইতিতে পৌঁছে যা শেষমেশ ভুডু ধর্মে মিশে যায়।

প্রকৃতিতে জোম্বি পিঁপড়া, জম্বি-শামুক, জম্বি মাকড়সা এমনকি জম্বি-ভাইরাসও আছে। বিশেষ ছত্রাক পিঁপড়ার শরীরে প্রবেশ করে তার স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রাস করে। জম্বি-পিঁপড়াকে বাসা ছাড়তে বাধ্য করে। মগডালের পাতার নিচে জম্বি-পিঁপড়া আটকে থেকে মারা যায়। ছত্রাক ছড়িয়ে যায় অন্য পিঁপড়ার শরীরে। জম্বি-শামুক পরজীবী কৃমির শিকার হলে আলো ভয় পায়।স্বাভাবিক আচরন পাল্টে গেলেই পাখি সহজেই শামুক ও কৃমিটি খেয়ে ফেলে। জম্বি-মাকড়সার পিঠে বোলতা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা মাকড়সার শরীরে এমন কেমিক্যাল ছড়ায়, যার ফলে মাকড়সাটি তার স্বাভাবিক জাল বোনা ছেড়ে – বোলতার লার্ভার সুরক্ষার জন্য বিশেষ ধরণের শক্ত জাল বুনতে বাধ্য হয়। মানুষের ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর মানসিক বা শারীরিক অসুস্থতায় জম্বির মতো আচরণ দেখা যেতে পারে। জলাতঙ্কের ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, মুখ থেকে লালা ঝরে,আচরণগত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কোটার্ড ডিলুশন – একটি বিরল মানসিক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনি মারা গেছেন, তার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পচে গেছে। এই সবক্ষেত্রে আচরণগত বদল – কমন।

‘জম্বি’ আসলে সামাজিক রাজনীতির স্বাভাবিক শব্দ হয়ে উঠেছে। সমাজ-মাধ্যমে একটি বিশেষ আচরণ বা অবস্থান জম্বি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সমকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানে জম্বি -মতাদর্শ, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক চরিত্র আসলে মৃত” বা অপ্রাসঙ্গিক। এই জম্বি রা সচেতন দিকনির্দেশনা ছাড়াই সমাজে টিকে থাকে এবং পুরনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি করে। জম্বি-মতাদর্শ বলতে এমন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক তত্ত্বকে বোঝায় যা ট্রিকল-ডাউন ইকোনমিক্স বা চরম নব্য-উদারতাবাদের মত বারবার ব্যর্থ। কিন্তু নীতি নির্ধারকদের মধ্যে তা বারবার ফিরে আসে। মরতে চায় না। জম্বি-গণতন্ত্র, যেখানে নির্বাচনের মতো গণতান্ত্রিক কাঠামো বা আনুষ্ঠানিকতা কাগজে-কলমে টিকে থাকে, কিন্তু ভেতরে গণতন্ত্রের আসল প্রাণশক্তি ও জনগণের অধিকার মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। জম্বি-নেতা – যুগের সঙ্গে নতুন কোনো ধারণার জন্ম দিতে পারেন না। পুরনো জাতিগত বা সামাজিক ক্ষোভকে উস্কে দেয় টিকে থাকার জন্যও। আজকাল- রাজনীতির মৃত তহবিলকেও অর্থনীতির ভাষায় ‘জম্বি-কর্মকাণ্ড’ বলছেন কেউকেউ।

এক যৌবন কুস্তিগির অতীন্দ্রনাথ বসুর, আরেক যৌবন কল্পনার বাঁটুলের। দিন বদলানোর যৌবন আজও রাস্তায়। মিছিলে। শ্রমে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধানের ক্ষেতে, জীবনের সংগ্রামে খুঁজছে – জীবনের মানে, সময়ের দায়। মাঝের এই ১০০ বছরে দিন বদলের ডাক দিয়ে দিনবদল করেছেন যারা – প্রশ্ন ও দেশহিত ছিল তাদের চালিকা। কিন্তু আজকাল, সমাজ-রাজনীতি- অর্থনীতি-সম্প্রীতির প্রশ্নে এদের একটা অংশ হয়ে উঠেছে প্রশ্নহীন, অনুকরণ-প্রিয় – জম্বি। তবে, এই গল্পের শেষে সামান্য আলোর রশ্মি আছে। আইজ্যাক ম্যারিয়নের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত – ২০১৩ সালের সিনেমা ‘ওয়ার্ম বডিস’-এ দেখানো হয়েছে – জম্বিরাও শেষমেশ ভালবাসতে জানে। তবে সে পথ কঠিন, দীর্ঘ। আমেরিকান জম্বি-কমেডি সিনেমার শেষে- ধীরে ধীরে একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে জীবনে ফিরে আসেন যিনি, তিনি প্রেমিক। ভালবাসা পেলে জীবন লণ্ডভণ্ড হলেই না জীবন! – তাই, এতো সুন্দর সভ্যতায়, গানের দেশে, প্রেমের দেশে – জম্বিও বদলাবে। গীতা হোক বা মার্ক্সবাদ – পরিবর্তন সত্য। – কী বলেন!

অন্যান্য প্রতিবেদন.