রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আজিকে তোমার মধুর মুরতী, হেরিনু শরত প্রভাতে..”। নীল আকাশের সাদা মেঘ, ক্ষেত বা নদীর কূলে কাশফুল জানান দেয় শরৎকাল সমাগত। বাঙালির প্রিয় শারদ উৎসব। মায়ের আগমন এবারে ঘোড়ায় চড়ে। পঞ্জিকা মতে আসা ও যাওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে। দেবীর আগমন ঘোড়ায়, যার ফল হিসেবে শাস্ত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত। দেবী সিংহ বাহনে চড়ে আসেন না। প্রতি বছরে ভিন্ন ভিন্ন বাহনে আগমন ও গমন ঘটে। গজ, ঘোটক, নৌকা ও দোলায় চড়ে দেবী আগমন আর গমন করেন।

বিখ্যাত ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ পটুয়া শশীবাবু ঘোষাল বাড়ির ছোট ছেলে রুকুকে মহিষাসুর বধের পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনা করছিলেন তখন বলেন, “দেবতাদের তেজপুঞ্জ থেকে সৃষ্টি হলেন মা দুর্গা। শিব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনু আর বাণ, যম দিলেন কালদণ্ড, ইন্দ্র দিলেন বজ্র, বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার, আর হিমালয় দিলেন সিংহ। এই দশ হাতে দশ অস্ত্র নিয়ে মা দুর্গা সিংহবাহিনী হয়ে যুদ্ধ করলেন মহিষাসুরের সঙ্গে।” দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির স্থাপত্য শিল্পে একটি পৌরাণিক রক্ষক প্রাণীকে পাওয়া যায় যার মুখ সিংহ বা ঘোড়ার মতো। আবার কোথাও হাতির মাথা দেখা যায়। প্রাচীন শিল্পকলা, ভাস্কর্য এবং মন্দির স্থাপত্যে এই প্রাণীর মোটিফ উঠে আসে।
আজও বহু বনেদি বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপ বা দালানে সিংহ রূপী ঘোড়া দেখতে পাওয়া যায়। ঘোটকমুখী সিংহ থাকে। বহু গবেষকদের মতে, ঘোটকমুখী সিংহ আসলে মন্দির স্থাপত্যের পৌরাণিক প্রাণী বা মন্দিরের রক্ষাকর্তা ভায়ালার থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছে। মন্দির স্থাপত্যের সামনের অংশে বা প্যানেলের মধ্যে ভায়ালাকে পাওয়া যায়। বাংলায় বর্ধমান জেলায় বিভিন্ন স্থানে ঘোড়ায় চড়া যুদ্ধ দেবীকে পুজো করা হয়। ঘোড়া প্রাচীন যুদ্ধক্ষেত্রের এক অপরিহার্য অংশ। যুদ্ধরথ টানা, অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের ময়দানে চালিকাশক্তি ছিল ঘোড়া। ভায়ালাকে আবার অনেকে ড্রাগনের সঙ্গে তুলনা টেনেছেন। কুমারটুলির ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রাচীন প্রতিমার বাহন সিংহের মুখটি সত্যিই ড্রাগনের মতো। তবে ঐতিহ্যগতভাবে প্রাণীর রূপটি আসলে ঘোটকাকৃতি সিংহ।

বাংলার টেরাকোটা মন্দিরগুলিতে মন্দির রক্ষক হিসেবে ভায়ালা প্রাণীর ভাস্কর্য এক অপূর্ব শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যে ওড়িশায় একে স্থানীয়ভাবে বিদাল (Vidala) বলা হয়।
প্রাচীন স্থাপত্য ও টেরাকোটা শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে বোরাগড়ি গ্রাম বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে। এখানকার মন্দির নিদর্শনের গায়ে পৌরাণিক কাহিনী, দেবদেবী, লতা-পাতা, নান্দনিক কাজ শিল্পকলার অংশ। এই শিল্পকর্মগুলি তৎকালীন শিল্পীদের কারিগরি দক্ষতার পরিচয় দেয়। ওই অঞ্চলের গোপাল মন্দিরে টেরাকোটা শিল্পে প্যানেলের মধ্যে মন্দির রক্ষক হিসেবে ভায়ালাকে পাওয়া যায়। সামনের দেওয়ালে ত্রিখিলানের উপরে টেরাকোটা প্যানেলের মধ্যে এই প্রাণীকে দেখা যায়। গর্ভগৃহে প্রবেশপথের উপরের দেওয়ালেও রয়েছে এমন শিল্পকর্ম। এ ছাড়া মন্দিরের পিছনের অংশের কোণেও এই ভয়ংকর প্রাণীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। প্রাচীন বাংলার পাল যুগে ধীমান ও তাঁর পুত্র বিটপাল ছিলেন শ্রেষ্ঠ শিল্পী ও ভাস্কর। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, একসময় বাংলায় বহু বিখ্যাত শিল্পীরা ছিলেন যারা চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও খোদাই শিল্পের এক নতুন ধারার সূচনা আনেন। ষোড়শ শতকে বাংলার টেরাকোটার শিল্পকর্মগুলো যারা নির্মাণ করেছিলেন, সেই শিল্পীদের নাম সাধারণত জানা যায় না। যে প্রতিষ্ঠা ফলক মন্দিরের ওপর থাকে, সেখানে কেবল বনেদি পরিবারের নাম ও প্রতিষ্ঠা সাল উল্লেখ থাকত। কারিগর শিল্পীরা সেখানে কেবলই নেপথ্যের থেকে যান। মন্দির স্থাপত্যে পোড়ামাটির অলংকরণে নামহীন শিল্পীদের প্রচেষ্টায় দেবদেবী, সামাজিক দৃশ্য, পৌরাণিক প্রাণী, নকশা ইত্যাদি স্থান পেয়েছে মন্দিরগাত্রে। এরকই একটি শিল্পকাজ ভায়ালা। আজ সত্যিই এক চরম সংকটের মুখোমুখি এই ধরণের সূক্ষ্ম কারুকাজগুলো। সংরক্ষণের অভাবে ও পরিকল্পনাহীন সংস্কারে নষ্ট হতে বসেছে। এই শিল্পনিদর্শন বাংলার মন্দির স্থাপত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে আজও সজীব করে রেখেছে।

