পঞ্জিকার পাতা উল্টে ক্যালেন্ডারের নিয়মেই বিদায় নিলেন উমা। আলো ঝলমলে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসের পথে পা বাড়ালেন দেবী। কিন্তু রেখে গেলেন এক অমোঘ ক্ষত এবং গভীর আত্মদর্শনের বার্তা। যে বাংলার মাটিতে শতাব্দি ধরে বিজয়া মানেই ছিল সর্বধর্মের মিলনমেলা, কোলাকুলির ওমে জমে থাকা অভিমান ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাওয়া, সেই বাংলার আকাশেই আজ দীর্ঘ ছায়া ফেলছে রাজনীতির নোংরা কাদা ও মেরুকরণের বিষবাষ্প।
গতকাল মুখ্যমন্ত্রী নিদান দিয়েছেন প্রতিমা স্পর্শের ক্ষেত্রে ‘সনাতনী’ হওয়া আবশ্যক৷ এই বার্তা শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, বরং তা বাঙালির বহুযুগের সর্বজনীন সংস্কৃতির মূলে এক বড়সড় আঘাত। চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার অজুহাতে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে এক ভীতিপ্রসূত সংকীর্ণতা। কর্তব্যে গাফিলতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা যে কোনও ব্যক্তির হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে ব্যক্তির ধর্মপরিচয়কে জড়িয়ে ফেলার এই প্রবণতা এক উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ।
তবুও প্রশ্ন জাগে, এই রাজনৈতিক মেরুকরণ কি সত্যিই বাঙালির চিরন্তন উৎসবের স্পন্দনকে থামিয়ে দিতে পেরেছে? উত্তর খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে রাজনীতির ময়দানের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে। এই পুজোয় শহর দেখেছে আমীষ বিতর্কের উত্তাপ, বইপাড়ার গায়ে বুলডোজারের আঁচ আর চোরবাগানের বুকে এক মর্মান্তিক মৃত্যুমিছিল। বাঙালি দেখেছে রাজনীতির কালো ছায়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাঙালির দুর্গাপুজো তো কেবল কয়েকটি দিনের কড়চা নয়। এ এক বোধন, এক মহোৎসব। যে উৎসবে কোনও ধর্ম বা জাতপাতের দেওয়াল থাকে না। চণ্ডীপাঠের সাথে মিশে যায় আজানের সুর, ফুচকার দোকানে দীর্ঘ লাইনে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অচেনা দুই বন্ধু। বিজয়ার শাঁখের আওয়াজ যখন বেজে ওঠে, তখন তা সমস্ত মেঘ ভেদ করে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাঙালি মানেই এক চিরকালীন উৎসবের নাম, যার কোনও ধর্মে বাঁধার প্রাচীর নেই।
বিজয়া মানে কেবল কোলাকুলি বা নাড়ু-নিমকি নয়। বিজয়া মানে দীর্ঘদিন পরে ঢাকির বাড়ি ফেরা—কাঁধে ঝোলা, পকেটে সামান্য কটা টাকা আর ঘরের টান। বিজয়া মানে উমার কপালে সিঁদুর ছোঁয়াতে গিয়ে অজান্তেই চোখের কোণে জমে ওঠা নোনা জল। অথচ আজকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিসরে সমাজ নানা প্রান্তে বিভক্ত। রাজনীতির নোংরা কাদা আমাদের ঘরের অন্দরেও বিভেদের দেওয়াল তুলছে। মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে, বিশ্বাসের জমিতে ফাটল ধরাচ্ছে সংকীর্ণ স্বার্থ। কিন্তু দুর্গাপুজো আর বিজয়া আমাদের যে সর্বজনীনতার শিক্ষা দেয়, তা কি ওই রাজনীতির কাঁটাতারে আটকে থাকার মতো? নাহ্৷
আজ, দশমীর এই গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে আমাদের সমস্ত হিসাবের পাতা উড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। ক্ষমতার লোভ, ঘৃণার বাজার আর সহিষ্ণুতার অভাব—এটাই তো আসল অসুর, যাকে কেবল প্রতিমার বিসর্জনে মারলে চলে না। এই অসুর তো লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের অন্তরে। উমা চলে গেলেন বটে, কিন্তু রেখে গেলেন সেই পরম আশ্বাসের বাণী—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”
আসছে বছর মা যখন আবার আসবেন, তখন যেন এই শহরটা আরও একটু বেশি আপন হয়, আরও একটু বেশি সুন্দর হয়। আসছে বছর যেন চাষা তার ফসলের সঠিক দাম পায়৷ আসছে বছরে যেন ভেসে না যায় শান্তিপুরের গ্রাম৷ আসছে বছর যেন সবার পেটে ভাত থাকে আর সবার মাথায় ছাদ৷ আসছে বছর যেন কোনো প্রসূতিকে জাতের জন্য পড়ে থাকতে না হয় ফুটপাতে।আসছে বছরের পথ চলায় আমাদের বাংলা যেন কোনও দিনই ভুলে না যায় তার মূল ধর্ম— মানবধর্ম। রাজনীতির বিভাজন আর সংকীর্ণতার দেওয়াল ভেঙে সেই মানবধর্মের জয়গান গাওয়ার অঙ্গীকার নিয়েই আজ বাঙালি আবার বুক বাঁধছে এক দীর্ঘ বছরের প্রতীক্ষায়।

